Homeদক্ষিণ দিনাজপুরবালুরঘাটবালুরঘাট হাসপাতালেই বসছে অত্যাধুনিক ক্যাথ ল্যাব, এবার জেলাতেই মিলবে কলকাতার মানের ‘হার্ট কেয়ার’

বালুরঘাট হাসপাতালেই বসছে অত্যাধুনিক ক্যাথ ল্যাব, এবার জেলাতেই মিলবে কলকাতার মানের ‘হার্ট কেয়ার’

নিউজ ডেস্ক; হার্টে সমস্যা ধরা পড়লেই এত দিন দক্ষিণ দিনাজপুরের বহু রোগীর সামনে কার্যত একটি পথই খোলা থাকত—জেলার বাইরে গিয়ে
resizeplus_Screenshot 2026-08-30 133947_edited (1)

নিউজ ডেস্ক; হার্টে সমস্যা ধরা পড়লেই এত দিন দক্ষিণ দিনাজপুরের বহু রোগীর সামনে কার্যত একটি পথই খোলা থাকত—জেলার বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানো। বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের জটিল সমস্যা, রক্তনালিতে ব্লকেজ কিংবা দ্রুত পরীক্ষা ও ইন্টারভেনশনের প্রয়োজন হলে কলকাতা অথবা দুর্গাপুরের হাসপাতালের উপর নির্ভর করতে হত রোগী ও তাঁর পরিবারকে। সেই ছবিই এবার বদলানোর পথে। বালুরঘাট জেলা হাসপাতালেই অত্যাধুনিক ক্যাথ ল্যাব তৈরির অনুমোদন দিয়েছে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। শুক্রবার বালুরঘাটের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এই খবর জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বালুরঘাটের বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার।

ক্যাথ ল্যাব চালু হলে দক্ষিণ দিনাজপুরের হৃদরোগীদের জন্য চিকিৎসার পরিকাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসক মহলের একাংশ। হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে কোথাও ব্লকেজ রয়েছে কি না, রক্ত চলাচলে কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না—এ ধরনের বিষয় পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ক্যাথ ল্যাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাঞ্জিওগ্রাফির মতো পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট কিছু ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এই পরিকাঠামো ব্যবহার করা সম্ভব।

দক্ষিণ দিনাজপুরের ক্ষেত্রে এই পরিষেবার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ বালুরঘাট জেলা হাসপাতাল শুধু শহরের বাসিন্দাদের চিকিৎসার জায়গা নয়, জেলার প্রত্যন্ত এলাকার বহু মানুষও এই হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন অসুখ নিয়ে রোগীরা বালুরঘাটে আসেন। তাঁদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু এত দিন হাসপাতালে হার্টের জটিল সমস্যা নিয়ে কোনও রোগী এলে উন্নততর পরীক্ষা বা চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাঁকে অন্যত্র রেফার করার পরিস্থিতি তৈরি হত।

ফলে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের লোকেদের উপরেও অতিরিক্ত চাপ পড়ত। জরুরি পরিস্থিতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অন্য জেলায় বা কলকাতায় পৌঁছনো সহজ নয়। বিশেষ করে হৃদরোগের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা না গেলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই বালুরঘাট জেলা হাসপাতালেই যদি ক্যাথ ল্যাবের মতো পরিকাঠামো তৈরি হয়, তা হলে জেলার রোগীদের বড় অংশের সমস্যা কমতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।

ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবরেটরি বা ক্যাথ ল্যাব মূলত হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যা নির্ণয় এবং নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়। বিশেষ ধরনের ক্যাথেটার এবং ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে হৃদযন্ত্রের রক্তনালির ভিতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যায়। কোথাও রক্তনালি সরু হয়ে গিয়েছে কি না কিংবা ব্লকেজ তৈরি হয়েছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাঞ্জিওগ্রাফি এই ব্যবস্থার অন্যতম পরিচিত পরীক্ষা। হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লকেজের অবস্থান ও মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পেতে এই পরীক্ষা করা হয়। রোগীর পরিস্থিতি এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাথ ল্যাবের মাধ্যমে কিছু নির্দিষ্ট ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসাও করা সম্ভব। ফলে শুধু রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেই নয়, চিকিৎসার পরবর্তী ধাপেও এই পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

তবে বালুরঘাটে ক্যাথ ল্যাব চালু হলে তার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, প্রযুক্তিবিদ এবং অন্যান্য সহায়ক পরিকাঠামোও নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, শুধু অত্যাধুনিক যন্ত্র বসালেই পরিষেবা সম্পূর্ণ হয় না। ২৪ ঘণ্টার জরুরি পরিষেবা, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং দ্রুত রোগী ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকলে তবেই ক্যাথ ল্যাবের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব।

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের অনুমোদনের খবর সামনে আসার পর সেই বিষয়েও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো সীমান্তবর্তী জেলায় উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসার পরিকাঠামো তৈরি হলে জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এত দিন যে রোগীদের সামান্য পরীক্ষার পরও বাইরে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ত, তাঁদের একটি বড় অংশকে স্থানীয় ভাবেই চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে।

শুক্রবার বালুরঘাটের অনুষ্ঠানে ক্যাথ ল্যাবের অনুমোদনের বিষয়টি তুলে ধরেন সুকান্ত মজুমদার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে এই পরিষেবা চালুর জন্য তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের পাশাপাশি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সেই আলোচনার পর ক্যাথ ল্যাব চালুর আশ্বাস মিলেছিল। এবার আনুষ্ঠানিক ভাবে অনুমোদনও পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি তাঁর।

সুকান্তের বক্তব্য, বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে ক্যাথ ল্যাব চালু হলে জেলার হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে। এত দিন যে রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে যেতে হত, তাঁদের জন্য এই পরিষেবা অনেকটাই স্বস্তি আনতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

এই ঘোষণার সময়ে বালুরঘাটের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। আগামী ২ সেপ্টেম্বর বালুরঘাটে আসার কথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজের পরিকাঠামো-সহ জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার একাধিক বিষয় তিনি খতিয়ে দেখতে পারেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে ক্যাথ ল্যাবের অনুমোদনকে চিকিৎসক মহলের একাংশ বালুরঘাটের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ বাস্তবায়িত হলে জেলার চিকিৎসা পরিকাঠামোয় আরও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তার সঙ্গে জেলা হাসপাতালেই হৃদরোগের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা যুক্ত হলে রোগীদের উপর থেকে বাইরের জেলার নির্ভরতা কমতে পারে। তবে কবে ক্যাথ ল্যাবের নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ শেষ হবে এবং কবে থেকে সাধারণ রোগীরা পরিষেবা পাবেন, সেই সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়।

বালুরঘাট জেলা হাসপাতালকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও তাই বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে জেলার বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। বিশেষ করে রাতের দিকে বা জরুরি পরিস্থিতিতে দূরের হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাওয়া পরিবারের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হৃদরোগের মতো ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও তীব্র।

ক্যাথ ল্যাব চালু হলে অন্তত হৃদযন্ত্রের রক্তনালির সমস্যা নির্ণয় এবং নির্দিষ্ট চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেই নির্ভরতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে কতটা সুবিধা রোগীরা পাবেন, তা নির্ভর করবে পরিষেবাটি কত দ্রুত চালু হয় এবং কী ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা সেখানে পাওয়া যায় তার উপর।

সব মিলিয়ে, দক্ষিণ দিনাজপুরের স্বাস্থ্য পরিষেবায় বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে ক্যাথ ল্যাবের অনুমোদনকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এত দিন হার্টের জটিল সমস্যায় জেলার বাইরে যাওয়ার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা কিছুটা হলেও কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন নজর, অনুমোদনের পর কত দ্রুত পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয় এবং কবে থেকে বাস্তবে রোগীদের জন্য এই পরিষেবা চালু করা সম্ভব হয়।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved