Homeজেলাএক্সক্লুসিভ অনুসন্ধান: পুজো প্রিভিউয়ের ৬০ কোটি নাকি টেন্ডারের ৮৫ কোটি? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে যাওয়া ৩০ লক্ষের ‘মানি ট্রেইল’ আসলে কোথায়?

এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধান: পুজো প্রিভিউয়ের ৬০ কোটি নাকি টেন্ডারের ৮৫ কোটি? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে যাওয়া ৩০ লক্ষের ‘মানি ট্রেইল’ আসলে কোথায়?

mamata

বিশেষ প্রতিনিধি:দুর্গাপুজো—বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, আবেগ আর শিল্পের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালেই কি নিঃশব্দে বোনা হয়েছিল এক বিপুল আর্থিক দুর্নীতির জাল? এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর সাম্প্রতিক নথিতে উঠে আসা তথ্যগুলো এবার শুধু আর জল্পনার স্তরে নেই, বরং তা পরিণত হয়েছে এক নিখুঁত ‘মানি ট্রেইল’-এর গোলকধাঁধায়।

মাসআর্ট (MassArt)-এর পুজো প্রিভিউয়ের টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের ‘অক্টেভ রেকর্ডস’, আর সেখান থেকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক চিত্র, যা রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে রীতিমতো ভূমিকম্প তৈরি করেছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আমলে এই পুরনো ফাইলগুলো নতুন করে খুলতেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু: ৩০ লক্ষ টাকা এবং ‘রয়্যালটি’র ধূম্রজাল ইডির তদন্তে একটি বিষয় সম্পূর্ণ স্পষ্ট— ইন্দ্রনীল সেনের মালিকানাধীন ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩.৮ কোটি টাকারও বেশি নগদ জমা পড়েছিল। আর সেই একই অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে।

জেরার মুখে ইন্দ্রনীল সেন এই লেনদেনের ব্যাখ্যা হিসেবে ‘রয়্যালটি’ (Royalty)-র তত্ত্ব খাড়া করেছেন। সাহিত্য ও সৃজনশীল কাজের জন্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর রয়্যালটি পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তদন্তমূলক সাংবাদিকতার আসল প্রশ্ন হলো, মুখের কথায় তো আর কোটি টাকার আইনি বৈধতা প্রমাণিত হয় না!

  • কোথায় সেই চুক্তিপত্র? কোন নির্দিষ্ট বই, গান বা সৃষ্টির জন্য এই বিপুল টাকা দেওয়া হলো?
  • হিসাবের খাতা কী বলছে? অক্টেভ রেকর্ডসের লেজারে (Ledger) এই লেনদেনের বিবরণ বা ‘ন্যারেশন’ হিসেবে কী লেখা রয়েছে?
  • করের হিসাব: এর টিডিএস (TDS) বা ইনভয়েস কোথায়? এই নির্দিষ্ট নথিপত্রগুলো সামনে না আসা পর্যন্ত এই ৩০ লক্ষ টাকাকে স্রেফ ‘শিল্পের পারিশ্রমিক’ বলে মেনে নেওয়া তদন্তকারীদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব।

পুজোর টিকিটে ৬০ কোটির ভোজবাজি ও ইউনেস্কো-প্রতারণা এই আর্থিক কেলেঙ্কারির দ্বিতীয় অঙ্কটি আরও ভয়াবহ। কলকাতার বাছাই করা ২৪টি পুজো সাধারণ মানুষকে দেখানোর নাম করে ‘মাসআর্ট’ যে প্রিভিউ শোয়ের আয়োজন করেছিল, তা ঘিরেই রয়েছে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ। ইডির দাবি, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এক লক্ষেরও বেশি টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল, যার দাম ছিল ১,৭৪৯ থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত।

  • হিসাবের গরমিল: ন্যূনতম দাম ধরলেও এই টিকিট বিক্রি থেকে আয় হওয়ার কথা অন্তত সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। কিন্তু ইডি সূত্রের খবর, এই সংগ্রহের মোট পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা ছুঁতে পারে।
  • টাকা গেল কোথায়? অভিযোগ, এই বিপুল টাকার বড় অংশই নগদে তুলে নেওয়া হয়েছে অথবা ‘বিবিধ খরচ’ দেখিয়ে হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে।
  • ইউনেস্কোর নাম ভাঙানো: সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো, টিকিট বিক্রির প্রচারে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO)-র নাম ও লোগো ব্যবহার করা। অথচ, তদন্তে জানা যাচ্ছে মাসআর্টের সঙ্গে ইউনেস্কোর কোনও অফিশিয়াল বা বাণিজ্যিক চুক্তিই ছিল না। ভুয়ো পরিচয়ে তোলা এই কোটি কোটি টাকার শেষ গন্তব্য কোথায়?

৮৫ কোটির টেন্ডার-সিন্ডিকেট: তৃতীয় মানি ট্রেইল ইডির স্ক্যানারে রয়েছে দুর্নীতির আরও একটি সমান্তরাল রাস্তা। তদন্তকারীদের দাবি, ইন্দ্রনীল সেন মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দফতর থেকে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার সরকারি টেন্ডার এমন কিছু সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল, যার মালিক ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং দীপেশ রায়ের মতো সেন-ঘনিষ্ঠরা। অভিযোগ, কাজ পাওয়ার পর ওই সংস্থাগুলো থেকে টেন্ডারের টাকার বড় অংশ সাব-কন্ট্রাক্টের নামে ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রিত সংস্থায় ঘুরে এসেছে এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ তোলা হয়েছে।

বিন্দুগুলো কি একই সরলরেখায়? এই মুহূর্তে ইডির হাতে তিনটি আলাদা আর্থিক দুর্নীতির ছক রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্লাইম্যাক্স হলো— এই তিনটির মধ্যে কি কোনও যোগসূত্র রয়েছে?

অক্টেভ রেকর্ডসে জমা পড়া ৩.৮ কোটি নগদ কি আসলে মাসআর্টের পুজো প্রিভিউয়ের টিকিট বিক্রির কালো টাকা? নাকি তা ৮৫ কোটির টেন্ডার থেকে আসা কাটমানি? আর সেই টাকারই একাংশ কি ‘রয়্যালটি’র ছদ্মবেশে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনও রাজনৈতিক তরজায় মিলবে না। প্রমাণ করতে গেলে মেলাতে হবে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ইনভয়েস এবং লেনদেনের তারিখ (Chronological Banking Map)। যদি দেখা যায় যে, টিকিট বিক্রির সময়, টেন্ডার পাসের সময় এবং অক্টেভ রেকর্ডসে নগদ জমা পড়ার সময়কাল একেবারে গায়ে গায়ে লেগে আছে, তবে তা রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সিলমোহর হয়ে দাঁড়াবে।

২৯ সেপ্টেম্বরের তল্লাশিতে বাজেয়াপ্ত হওয়া ডিজিটাল ডিভাইস ও অডিট রিপোর্টের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। এফজেড১০৭৩ (FZ1073) বিমানের ব্ল্যাক বক্স যেমন মাঝআকাশের রহস্য ফাঁস করে, তেমনই এই বাজেয়াপ্ত হার্ডড্রাইভগুলোই এবার বলে দেবে, উৎসবের আলোর নিচেই কত বড় অন্ধকারের জাল বিছানো ছিল। আসল সত্য এখন লুকিয়ে রয়েছে ব্যাংক স্টেটমেন্টের ঠিক পরের পাতাতেই।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved