
নিউজ ডেস্ক; প্যারিসের মাটিতে ভারতীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। ফ্রান্সের রাজধানীর উপকণ্ঠে বুসি-সাঁ-জর্জ এলাকায় উদ্বোধন হল BAPS স্বামীনারায়ণ হিন্দু মন্দিরের। রবিবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ভারত ও ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতার প্রসঙ্গ।
মন্দির উদ্বোধনকে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, প্যারিসের এই বিশাল স্বামীনারায়ণ মন্দির দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন মাইলস্টোন’। মন্দিরটি আগামী দিনে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে সহযোগিতা, সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে থাকবে বলেও আশাপ্রকাশ করেন তিনি।
প্যারিসের পূর্ব উপকণ্ঠে বুসি-সাঁ-জর্জ এলাকায় তৈরি হয়েছে এই মন্দির। BAPS স্বামীনারায়ণ সংস্থার উদ্যোগে নির্মিত মন্দিরটি ফ্রান্সের প্রথম ঐতিহ্যবাহী পাথরের হিন্দু মন্দির হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভারতীয় স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে তৈরি হলেও এর নির্মাণে রয়েছে ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ প্রয়াস।
মন্দিরের জন্য ব্যবহৃত পাথরের একটি বড় অংশ ভারতে প্রস্তুত করা হয়। ভারতীয় শিল্পীরা সেই পাথরে সূক্ষ্ম কারুকাজ করেন। পরে খোদাই করা পাথরগুলি ফ্রান্সে নিয়ে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্মাণকৌশলের সাহায্যে মন্দিরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা এবং আধুনিক ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই মেলবন্ধনকেই বিশেষ ভাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
মোদীর কথায়, এই মন্দির ‘মেড ইন ইন্ডিয়া, বিল্ট ইন ফ্রান্স’-এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। অর্থাৎ ভারতের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যজ্ঞান যেমন এখানে রয়েছে, তেমনই রয়েছে ফরাসি প্রযুক্তি ও নির্মাণ দক্ষতার ছাপ। দুই দেশের মধ্যে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনাকে এই মন্দির আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্দিরটির প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধনী আচার সম্পন্ন করেন BAPS-এর আধ্যাত্মিক নেতা মহন্ত স্বামী মহারাজ। উদ্বোধন উপলক্ষে ২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘ফেস্টিভ্যাল অফ কালচার’-এর আয়োজন করা হয়েছে। এই উৎসবে ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, বৈদিক যজ্ঞ এবং নানা ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এই মন্দিরের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশের মাটিতে এমন একটি মন্দির ভারতীয় সংস্কৃতি, দর্শন ও জীবনধারার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের পরিচয় আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে ভারতীয় ও ফরাসি জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও আরও গভীর হবে।
মন্দিরটি ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’— অর্থাৎ ‘সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার’—এই ভারতীয় ভাবনাকে সামনে রেখে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন মোদী। তাঁর মতে, ভারতীয় দর্শনের মূল বার্তা হল শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। সেই মূল্যবোধই এই মন্দিরের মাধ্যমে ফ্রান্স তথা ইউরোপের বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
BAPS-এর পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, মন্দিরটি শুধু উপাসনার স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক পরিষেবা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে এখানে এসে ভারতীয় ঐতিহ্য, শিল্প ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, সেই ভাবনাও রয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষের।
প্যারিসে একটি স্থায়ী হিন্দু মন্দির ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার ভাবনা নতুন নয়। BAPS-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে এমন একটি আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরির স্বপ্নের সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় ৫৬ বছর আগে। দীর্ঘ পরিকল্পনা, জমি নির্বাচন, নকশা, পাথর খোদাই এবং নির্মাণপর্ব পেরিয়ে অবশেষে ২০২৬ সালে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেল।
বুসি-সাঁ-জর্জের ‘এস্প্লানাদ দে রিলিজিয়ঁ এ দে কালচার’ এলাকায় মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তরফেও এই প্রকল্পকে স্বাগত জানানো হয়েছে। মন্দির উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ফরাসি সমাজের সাধারণ মানুষের যোগাযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্দির উদ্বোধনের ভাষণে ভারত-ফ্রান্স দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক বা কৌশলগত সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একাধিক ক্ষেত্রে ভারত ও ফ্রান্স একসঙ্গে কাজ করছে।
মোদী বলেন, ভারত ও ফ্রান্স মিলে একটি ‘স্পেশাল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ গড়ে তুলছে। এই সম্পর্কের শক্তি শুধু বর্তমানের রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যোগাযোগেও নিহিত। ফ্রান্সের মাটিতে ভারতীয় সেনাদের আত্মত্যাগ, সংস্কৃত ভাষা প্রচারে ফরাসি পণ্ডিতদের ভূমিকা এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার প্রতি ফরাসি সমাজের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন ত
চলতি ২০২৬ সালকে ভারত ও ফ্রান্স যৌথ ভাবে ‘ইন্ডিয়া-ফ্রান্স ইয়ার অফ ইনোভেশন’ হিসেবে পালন করছে। সেই আবহে প্যারিসে স্বামীনারায়ণ মন্দিরের উদ্বোধন দুই দেশের সম্পর্কের সাংস্কৃতিক দিকটিকেও সামনে নিয়ে এল। প্রধানমন্ত্রীর আশা, এই মন্দির আগামী দিনে ইউরোপে ভারতীয় সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং সেবার আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments