
নিউজ ডেস্ক : বর্ষা যত জাঁকিয়ে বসছে, ততই মাথাচাড়া দিচ্ছে ডেঙ্গির আশঙ্কা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য প্রশাসনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক স্তরে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। ডেঙ্গি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের উপরেও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যজুড়ে আগামী ৩, ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিন দিনের এই কর্মসূচিতে বাড়িঘর থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং নির্মাণস্থল—সব জায়গাতেই জমা জলের উৎস খুঁজে তা সরিয়ে ফেলার উপর জোর দেওয়া হবে।
পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল রাজ্যবাসীকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, ডেঙ্গির মরশুম শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে এখন থেকেই সাবধান না হলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনের তরফে নিয়মিত নজরদারি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পাশাপাশি নাগরিকদের নিজেদের বাড়ি এবং আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখার আবেদনও জানানো হয়েছে।
বর্ষার সময় বিভিন্ন জায়গায় জল জমে থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই জমা জলই ডেঙ্গির বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পরিষ্কার ও স্থির জল বেশ কিছুদিন জমে থাকলে সেখানে মশার লার্ভা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অনেক সময় বড় কোনও জলাশয় নয়, বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা ছোট পাত্রেই বিপদ লুকিয়ে থাকে। ফুলের টবের নীচের ট্রে, পুরনো বালতি, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের সামগ্রী, ডাবের খোলা, টায়ার, ছাদের কোণে জমে থাকা জল কিংবা নির্মাণস্থলে পড়ে থাকা কোনও পাত্র—সামান্য জলও মশার প্রজননের জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
তাই ডেঙ্গি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বড়সড় কোনও পদক্ষেপের পাশাপাশি এই ছোট ছোট উৎসগুলিকে চিহ্নিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নাগরিকদের নিয়মিত বাড়ি ও আশপাশ পরিদর্শনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর রাজ্যজুড়ে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হবে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল দ্রুত চিহ্নিত করে তা নির্মূল করা।
শুধু পুরসভা বা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরাই এই কাজে যুক্ত থাকবেন না। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের পরিসর পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সক্রিয় হতে বলা হয়েছে। স্কুল-কলেজ, আবাসন, অফিস, হাসপাতাল, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জমা জল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
বিশেষ নজর থাকবে নির্মাণস্থলগুলির উপরেও। নির্মাণকাজ চলা জায়গায় বিভিন্ন ড্রাম, বালতি, গর্ত, পাইপ কিংবা অন্যান্য সামগ্রীতে বৃষ্টির জল জমে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন সেই জল পড়ে থাকলে মশার বংশবিস্তারের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই অভিযান চলাকালীন নির্মাণস্থলগুলিও খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেঙ্গি প্রতিরোধে প্রশাসনের উদ্যোগ যতই বড় হোক, নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া তা পুরোপুরি সফল করা কঠিন। তাই প্রত্যেক পরিবারকে নিজেদের বাড়ি এবং বাড়ির চারপাশ নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দায় কোথাও জল জমে রয়েছে কি না, ফুলের টবের নীচে জল আটকে আছে কি না, পুরনো পাত্র বা টায়ারে বৃষ্টির জল জমেছে কি না—এই বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই দায়িত্ব শেষ নয়। বাড়ির আশপাশ, গলিপথ কিংবা প্রতিবেশী কোনও জায়গাতেও যদি জল জমে থাকে, সেক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো যেতে পারে।
কারণ মশা কোনও একটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আশপাশের জমা জল থেকেও মশার সংখ্যা বাড়তে পারে। ফলে ডেঙ্গি প্রতিরোধে গোটা পাড়া বা এলাকার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বর্ষাকালে জ্বর, শরীর ব্যথা কিংবা দুর্বলতাকে অনেকেই সাধারণ ঋতুকালীন অসুস্থতা বলে ধরে নেন। কিন্তু ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়ার সময় এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সরকারি ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
ডেঙ্গির ক্ষেত্রে রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বরের সময় পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোনও উপসর্গ গুরুতর হয়ে উঠলে দেরি না করে চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়া উচিত।
ডেঙ্গি মোকাবিলায় মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি করাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়মিত আবর্জনা পরিষ্কার করা, জল জমতে না দেওয়া এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করার মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রীও রাজ্যবাসীকে এই কাজে সামিল হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। প্রশাসনের তরফে অভিযান চললেও প্রতিদিনের সচেতনতা না থাকলে ফের বিভিন্ন জায়গায় জল জমতে পারে। তাই তিন দিনের অভিযানকে কেন্দ্র করে শুধু একবার পরিষ্কার করাই নয়, পরবর্তী দিনগুলিতেও সেই অভ্যাস বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে কয়েক দিনের ব্যবধানে বাড়ি ও আশপাশ পরীক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করা ভাল। কোথাও অল্প জল জমে থাকলেও তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
ডেঙ্গি প্রতিরোধের পাশাপাশি নগর পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী। নিউ টাউন এবং সংলগ্ন এলাকায় যানজট কমানোর লক্ষ্যে মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে মহিষবাথান হয়ে নিউ টাউন কনভেনশন সেন্টার পর্যন্ত একটি নতুন উড়ালপুল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
নিউ টাউন অঞ্চলে গত কয়েক বছরে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। অফিসপাড়া, আবাসন এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও পরিষেবা কেন্দ্রের কারণে ব্যস্ত সময়ে যানজট তৈরি হয়। সেই চাপ কমাতেই প্রস্তাবিত উড়ালপুলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থাৎ এক দিকে বর্ষাকালীন রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পুর প্রশাসনের তৎপরতা, অন্য দিকে শহর ও নগরাঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা—দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক উদ্যোগ বাড়ানোর বার্তা মিলেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে কয়েকটি বিষয়ে নিয়মিত নজর রাখতে হবে। বাড়ি ও আশপাশে জমা জল দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। ফুলের টব, পাত্র, পুরনো টায়ার এবং ছাদের নীচু অংশে জল জমছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে।
বৃষ্টির পরে একবার বাড়ি পরিষ্কার করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কয়েক দিন পর ফের একই জায়গায় জল জমেছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন। আবাসন, স্কুল, অফিস কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
কোনও এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়ে গেলে বা বড় কোনও জমা জলের উৎস নজরে এলে স্থানীয় পুরসভা বা প্রশাসনকে জানানো যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডেঙ্গির মরশুমে এখন থেকেই সতর্ক হওয়ার বার্তা দিয়েছে প্রশাসন। আগামী ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের বিশেষ অভিযান সেই প্রস্তুতিরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তিন দিনের কর্মসূচির বাইরে প্রতিদিনের সচেতনতাই শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। বাড়ি, কর্মস্থল এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জমা জল দ্রুত সরানো এবং জ্বর হলে অবহেলা না করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments