
নিউজ ডেস্ক : রাত পেরিয়ে ভোর। কলকাতার ব্যস্ত ক্যামাক স্ট্রিট তখন প্রায় নিস্তব্ধ। সেই সময়েই একটি বহুতলের অফিস চত্বরে ছয় জনের সন্দেহজনক উপস্থিতিকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল। অভিযোগ, ভোর সাড়ে ৪টার পর ক্যামাক স্ট্রিটের একটি বহুতলের উপরের দিকে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের অফিস চত্বরে ওই ছয় জনকে দেখা যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। পরে ছয় জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তৃণমূলের তরফে এই ঘটনার পিছনে বিজেপির ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্য দিকে, সেই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে বিজেপি। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই। ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের রাতের ঘটনা এখন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি পুলিশের তদন্তের বিষয়ও হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৯ নম্বর ক্যামাক স্ট্রিটের একটি বহুতলের উপরের দু’টি তলায় তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস রয়েছে। সেই অফিস চত্বরে বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে ছয় জন অপরিচিত ব্যক্তির উপস্থিতি নজরে আসে। সময়টা ছিল ভোর সাড়ে ৪টার পর।
তাঁদের গতিবিধি সন্দেহজনক বলে মনে হওয়ায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়েই শেক্সপিয়র থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে ছয় জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয় এবং তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা যায়।
কেন তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন, কী উদ্দেশ্যে তাঁদের ওই এলাকায় উপস্থিতি এবং অফিস চত্বরে কী ভাবে তাঁরা ঢুকলেন—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
ঘটনাটি নিয়ে সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, এই ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এমনকি বিজেপির সঙ্গে কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগ এখনও তদন্তসাপেক্ষ। গ্রেফতার হওয়া ছয় ব্যক্তির সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে কি না, সেই বিষয়ে পুলিশের তদন্তের ফলই চূড়ান্ত ছবি স্পষ্ট করতে পারে।
ঘটনার পর থেকেই ক্যামাক স্ট্রিটের ওই অফিসের সামনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বহুতলের নীচের গেটে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অফিসের আশপাশের পরিস্থিতির উপরেও নজর রাখছে পুলিশ প্রশাসন।
তৃণমূলের অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে বিজেপি। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর বক্তব্য, ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের পার্টি অফিস রয়েছে—এমন তথ্য তাঁর জানা নেই। তবে যদি কোনও ঘটনা ঘটে থাকে, তা হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি।
অর্থাৎ, এক দিকে তৃণমূলের তরফে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, অন্য দিকে বিজেপি সেই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করছে। ফলে ছয় ব্যক্তির পরিচয়, তাঁদের উদ্দেশ্য এবং ঘটনাটির প্রকৃত নেপথ্য কী—এই তিনটি প্রশ্নই আপাতত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি আরও একটি বিষয় পুলিশের নজরে এসেছে। ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের অফিসের পাশে ইন্ডাস্ট্রি হাউসের নীচে একটি এলইডি টিভি রাখা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেটি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ ওই এলইডি টিভি-সহ ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করছে। কী ভাবে সেটি সেখানে এল, কারা সেটি নিয়ে এসেছিল এবং ভোররাতের ঘটনার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না—এই সমস্ত বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশের তদন্তে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বহুতলে তাঁদের প্রবেশের পথ এবং তাঁদের গতিবিধির ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকদের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের আশপাশে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই আহ্বানের পর ধীরে ধীরে দলের কর্মী-সমর্থকেরা সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন।
ফলে অফিস চত্বরের আশপাশে ভিড় বাড়তে থাকে। সম্ভাব্য কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। ক্যামাক স্ট্রিটের মতো ব্যস্ত এলাকায় রাজনৈতিক জমায়েতের কারণে যাতে যান চলাচল কিংবা আইনশৃঙ্খলায় সমস্যা না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
এই ঘটনার আবহেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে আরও বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপের কথা সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ জানাতে দলের প্রতিনিধি দল দেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে চায় বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যপাল আরএন রবির কাছ থেকেও সময় চাওয়া হয়েছে।
তৃণমূলের বক্তব্য, রাজ্যের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। সেই বিষয়েই দুই সাংবিধানিক পদাধিকারীর কাছে বক্তব্য তুলে ধরতে চায় দল।
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনার সঙ্গে এই রাজনৈতিক কর্মসূচির সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলাদা ভাবে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে তদন্তের ফলের দিকে তাকানোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘটনাটি যে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তাপ বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট।
ক্যামাক স্ট্রিটের ভোররাতের ঘটনা নিয়ে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। ছয় ব্যক্তি কারা? তাঁরা কোথা থেকে এসেছিলেন? কী উদ্দেশ্যে ওই বহুতলে ঢুকেছিলেন? তাঁদের কাছে কী ছিল? এলইডি টিভিটি সেখানে কী ভাবে এল? এবং সর্বোপরি, এই ঘটনার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ রয়েছে কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ছয় জনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ফলে তদন্ত এগোলেই ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
এদিকে তৃণমূলের অভিযোগ এবং বিজেপির পাল্টা বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের বাইরে ঘটনার প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করবে তদন্তই। আপাতত ক্যামাক স্ট্রিটে বাড়তি পুলিশি নজরদারি রয়েছে এবং পরিস্থিতির উপর প্রশাসন কড়া নজর রাখছে।
গভীর রাতের ওই রহস্যজনক উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, তার উত্তর খুঁজতেই এখন পুলিশের তদন্তের দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ—সকলেই।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments