Homeহুগলিতারকেশ্বরনতুন বছরের শুরুতেই ভাবাদিঘির উপর দিয়ে ছুটবে ট্রেন? দ্রুত গতিতে চলছে তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর প্রকল্পের কাজ

নতুন বছরের শুরুতেই ভাবাদিঘির উপর দিয়ে ছুটবে ট্রেন? দ্রুত গতিতে চলছে তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর প্রকল্পের কাজ

নিউজ ডেস্ক; নতুন বছরের শুরুতেই কি ভাবাদিঘির বুক চিরে ছুটবে ট্রেন? রেল সূত্রের খবর তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্পের
resizeplus_kamarpukur-1

নিউজ ডেস্ক; নতুন বছরের শুরুতেই কি ভাবাদিঘির বুক চিরে ছুটবে ট্রেন? রেল সূত্রের খবর তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্পের বহু প্রতীক্ষিত অংশের কাজ এখন দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী বছরের শুরুতেই ভাবাদিঘির উপর নির্মীয়মাণ রেলসেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রামকৃষ্ণদেবের পবিত্র জন্মভূমি কামারপুকুরে। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকতে পারেন বলেও রেল সূত্রে জল্পনা রয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে এখনও সরকারি ভাবে কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা হয়নি। রেলের আধিকারিকেরা আপাতত প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে নিয়মিত এলাকায় পরিদর্শনে আসছেন রেলের শীর্ষ কর্তারা। সম্প্রতি পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার গীতিকা পাণ্ডেও ভাবাদিঘি এলাকা ঘুরে দেখেছেন। ২০২৬ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

রেল প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা এক শীর্ষ কর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, গোঘাট ও কামারপুকুরের মধ্যবর্তী অংশে রেললাইন বসানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাবাদিঘির উপর রেলসেতু নির্মাণের কাজও জোরকদমে চলছে। ইতিমধ্যে জলাশয়ের উপর নয়টি কংক্রিটের পিলার তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন সেই পিলারগুলির উপর গার্ডার বসানোর প্রস্তুতি চলছে। গার্ডার বসানোর কাজ শেষ হলেই সেতুর মূল কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

ভাবাদিঘিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে জট তৈরি হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল জলাশয় ভরাট করে রেললাইন নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, রেললাইন হোক, কিন্তু কোনও ভাবেই ভাবাদিঘি নষ্ট করা যাবে না। জলাশয়ের সঙ্গে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে বলেই তাঁদের বক্তব্য। এই দাবি ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়। বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে আদালতের হস্তক্ষেপে ভাবাদিঘি ভরাট না করে তার উপর সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় রেল।

শুধু সেতু তৈরি নয়, ভাবাদিঘি রক্ষার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নের জন্যও একাধিক পদক্ষেপ করেছে রেল। জলাশয়ের পাড় বাঁধানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল ও জলাশয়ের সংরক্ষণ—দুই দিক বিবেচনা করেই পাড়ের সৌন্দর্যায়নের কাজ করা হয়েছে বলে রেল সূত্রে খবর। গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রেলের অর্থেই সেখানে তৈরি হচ্ছে দোতলা স্কুল ভবন। ফলে রেললাইন নির্মাণের সঙ্গে স্থানীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে চলেছে।

কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটির মধ্যে প্রস্তাবিত রেলপথে একাধিক ছোট সেতু ও কালভার্ট থাকবে। গোঘাটের বন্যাপ্রবণ অমরপুর এলাকা এবং আমোদর নদীর উপর গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজও চলছে। বর্ষার সময়ে এই সব এলাকায় জল জমে যায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। তাই রেললাইন তৈরির সময় জলনিকাশির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের পরিকল্পনায় এমন ভাবে সেতু ও কালভার্ট তৈরি করা হচ্ছে, যাতে রেল চলাচলের পাশাপাশি এলাকার স্বাভাবিক জলপ্রবাহও বজায় থাকে।

তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল ২০১২ সালে। পরে ২০১৬ সালে তারকেশ্বর থেকে গোঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। অন্য দিকে, বিষ্ণুপুর থেকে জয়রামবাটির মধ্যে রেল পরিষেবা আগেই চালু হয়েছিল। কিন্তু গোঘাটের ভাবাদিঘি অংশে আটকে যায় প্রকল্পের কাজ। ফলে দুই প্রান্তের মধ্যে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ থাকা এই অংশের কাজ শেষ হলে তারকেশ্বর, কামারপুকুর, জয়রামবাটি এবং বিষ্ণুপুরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে।

রেল সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে হাওড়া থেকে বিষ্ণুপুর হয়ে বাঁকুড়া পর্যন্ত বন্দে ভারত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। যদিও এই পরিষেবা চালুর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সময়সূচি বা সরকারি ঘোষণা হয়নি। তবে রেললাইন সম্পূর্ণ হলে এই রুটে দ্রুতগতির ট্রেন চালানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাতে শুধু পর্যটক নয়, প্রতিদিনের যাত্রীদেরও সুবিধা হবে।

কামারপুকুর ও জয়রামবাটি রামকৃষ্ণদেব এবং সারদামায়ের সঙ্গে যুক্ত পবিত্র তীর্থস্থান। বিষ্ণুপুর তার টেরাকোটা মন্দির, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। তারকেশ্বরও দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই চারটি এলাকার মধ্যে রেল যোগাযোগ তৈরি হলে ধর্মীয় পর্যটন, ঐতিহাসিক পর্যটন এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আরামবাগ ও বিষ্ণুপুরের বহু মানুষ বর্তমানে সড়কপথে অথবা ঘুরপথে হাওড়ায় যাতায়াত করেন। রেললাইন চালু হলে তাঁদের সময় ও খরচ দু’টিই কমবে।

গোঘাটের বিধায়ক প্রশান্ত দিগার বলেন, কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিনের জট কেটে গিয়েছে এবং খুব তাড়াতাড়ি প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরই লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। তাঁর দাবি, আগের সরকারের সময়ে প্রকল্পের জটিলতা তৈরি হয়েছিল, এখন সেই বাধা কাটিয়ে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তবে ভাবাদিঘি বাঁচাও কমিটির বক্তব্যেও রয়েছে সতর্ক সমর্থনের সুর। কমিটির সম্পাদক সুকুমার রায় জানিয়েছেন, ভাবাদিঘির মানুষ কখনও রেলের বিরোধিতা করেননি। তাঁদের আপত্তি ছিল জলাশয় ভরাট করে রেললাইন নির্মাণের বিরুদ্ধে। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ রক্ষা করে রেললাইন তৈরি হোক—এটাই তাঁদের দাবি ছিল। কমিটির আর এক সদস্য কৃষ্ণা রায়ের বক্তব্য, ভাবাদিঘির উপর দিয়ে ট্রেন চলুক, পাশাপাশি জলাশয়ের উন্নয়ন ও সংরক্ষণও হোক।

ফলে বহু বছরের আন্দোলন, আদালতের নির্দেশ এবং প্রশাসনিক আলোচনার পরে ভাবাদিঘি এখন রেল সংযোগের নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। নির্মাণকাজ শেষ হয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হলে শুধু একটি রেল প্রকল্প পূর্ণতা পাবে না, দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আসবে। এখন নজর সেই প্রতীক্ষিত দিনের দিকে, যেদিন ভাবাদিঘির উপর দিয়ে প্রথম ট্রেন ছুটবে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved