নিউজ ডেস্ক : বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির মঞ্চে শক্তির পুরনো সমীকরণ কি বদলে যাচ্ছে? নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর হতে চলা ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে সেই প্রশ্নই ফের সামনে এসেছে। এক দিকে রয়েছে বিশ্বের উন্নত শিল্পোন্নত গণতন্ত্রগুলির জোট G7—যাদের হাতে এখনও ডলার, উন্নত প্রযুক্তি, গভীর আর্থিক বাজার এবং বিপুল মাথাপিছু সম্পদের শক্তি। অন্য দিকে সম্প্রসারিত BRICS Plus—যার শক্তির জায়গা বিপুল জনসংখ্যা, উৎপাদন ক্ষমতা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ক্রমশ বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক প্রভাব।
দুই জোটের চরিত্র অবশ্য একেবারেই আলাদা। G7 তুলনামূলক ছোট, সমমনস্ক এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারদের একটি গোষ্ঠী। BRICS Plus বরং অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়—রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের দিক থেকেও। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই তারা একটি অভিন্ন প্রশ্ন সামনে আনছে: বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কি আরও বেশি দেশের মধ্যে ভাগ হওয়া উচিত?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। নমিনাল GDP-র হিসাবে এখনও G7-এর শক্তি স্পষ্ট। কিন্তু Purchasing Power Parity বা PPP-এর মাপকাঠিতে ছবিটি অনেকটাই পাল্টে যায়। আর সেই জায়গাতেই BRICS-এর উত্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতির পর্যবেক্ষকেরা।
G7-এর শিকড় ১৯৭০-এর দশকের অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়। বর্তমানে এই গোষ্ঠীতে রয়েছে আমেরিকা, জাপান, জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি এবং কানাডা। ইউরোপীয় ইউনিয়নও আলোচনায় অংশ নেয়।
জনসংখ্যার বিচারে G7 বিশ্বের তুলনায় ছোট একটি গোষ্ঠী। মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম মানুষ এই দেশগুলিতে বাস করেন। কিন্তু সংখ্যার তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব অনেক বেশি।
G7-এর অন্যতম বড় শক্তি হল সদস্য দেশগুলির মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা। সবক’টি দেশই উচ্চ-আয়ের অর্থনীতি এবং পশ্চিমী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমেরিকার সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কও অধিকাংশ সদস্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য, উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা, পুঁজিবাজার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রভাব—সব মিলিয়ে G7 এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। নমিনাল GDP-র হিসাবেও এই সুবিধা স্পষ্ট।
BRICS-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিনকে নিয়ে ‘BRIC’ ধারণার মাধ্যমে। পরে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর গোষ্ঠীটি BRICS নামে পরিচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারণের ফলে গোষ্ঠীর পরিধি আরও বেড়েছে। মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ পূর্ণ সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশ অংশীদার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ফলে BRICS-এর ভৌগোলিক পরিসর এখন ইউরেশিয়া থেকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ এটি আর কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সমন্বয় নয়; বরং গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন শক্তিকে একই মঞ্চে আনার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা।
তবে BRICS Plus-কে G7-এর মতো সমমনস্ক জোট বলা যায় না। এখানে গণতান্ত্রিক দেশ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর রাষ্ট্র। ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি চিন, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশের উপস্থিতি তার বৈচিত্র্যকে স্পষ্ট করে।
এই দেশগুলিকে এক জায়গায় আনার মূল সূত্র তাই কোনও একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়। বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংস্কার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং আরও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দাবিই তাদের মধ্যে মিল তৈরি করছে।
G7 এবং BRICS-এর অর্থনৈতিক শক্তি তুলনা করতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় নমিনাল GDP। বর্তমান বাজার বিনিময় হারের ভিত্তিতে হিসাব করলে G7 এখনও অনেকটাই এগিয়ে। আমেরিকার বিশাল অর্থনীতি এই ব্যবধানের অন্যতম প্রধান কারণ।
প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির নমিনাল GDP-তে G7-এর অংশ প্রায় ৪৩ থেকে ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিপরীতে সম্প্রসারিত BRICS Plus-এর অংশ আনুমানিক ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ।
মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রেও দুই জোটের ব্যবধান যথেষ্ট। G7-এর গড় মাথাপিছু GDP ৫০ হাজার ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। BRICS Plus-এর ক্ষেত্রে সেই গড় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার ডলারের মধ্যে। ফলে ব্যক্তিগত সম্পদ, জীবনযাত্রার মান এবং ভোগক্ষমতার ক্ষেত্রে G7-এর সুবিধা এখনও বড়।
এখানেই BRICS-এর শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। একটি দেশের অর্থনীতিকে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে বিচার করলে তার অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। সেই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে Purchasing Power Parity বা PPP।
PPP-ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, BRICS Plus-এর সম্মিলিত অর্থনৈতিক ওজন বিশ্ব GDP-র প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশের কাছাকাছি বলে এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অন্য দিকে G7-এর অংশ প্রায় ২৯ থেকে ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারদরে G7-এর আর্থিক শক্তি বেশি হলেও, স্থানীয় ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনীতির প্রকৃত আকার বিবেচনায় BRICS Plus-এর ওজন আরও বড় হয়ে ওঠে।
এর একটি কারণ উৎপাদন ব্যয়। BRICS-এর একাধিক দেশে শ্রম, নির্মাণ এবং উৎপাদনের খরচ উন্নত পশ্চিমী অর্থনীতির তুলনায় কম। ফলে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে তুলনামূলক বেশি পণ্য, পরিষেবা বা পরিকাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
চিনের বিশাল শিল্পভিত্তি, ভারতের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ও পরিষেবা খাত এবং ইন্দোনেশিয়া-সহ বিভিন্ন উদীয়মান অর্থনীতির প্রসার BRICS-এর এই শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, BRICS Plus-এর অর্থনীতি সম্মিলিত ভাবে প্রায় ৩.৭ থেকে ৩.৮ শতাংশ হারে বাড়ছে।
এর মধ্যে ভারতের বৃদ্ধির হার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় অর্থনীতি প্রায় ৬.২ থেকে ৬.৬ শতাংশের গতিতে এগোচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চিনের ক্ষেত্রেও প্রায় ৪.২ থেকে ৪.৮ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিও BRICS-ঘনিষ্ঠ বৃহত্তর গোষ্ঠীর বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে।
অন্যদিকে G7-এর অর্থনীতিতে বৃদ্ধির গতি তুলনামূলক ভাবে কম। প্রতিবেদনে এই গোষ্ঠীর গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ১ শতাংশের সামান্য বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকা তুলনামূলক ভাবে শক্তিশালী থাকলেও ইউরোপের একাধিক অর্থনীতি মন্থরতার মুখে।
জার্মানির ক্ষেত্রে কম বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, শিল্পক্ষেত্রের চাপ এবং বয়স্ক জনসংখ্যার মতো কাঠামোগত সমস্যাও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তবে G7 বনাম BRICS Plus-এর শক্তির হিসাব শুধুমাত্র GDP দিয়ে শেষ করা যায় না। ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জ্বালানি, কৃষি, কাঁচামাল, খনিজ সম্পদ, শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং আর্থিক পরিকাঠামো।
G7-এর হাতে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা, পুঁজিবাজার এবং ডলারের মতো শক্তিশালী আর্থিক হাতিয়ার। বিপরীতে BRICS Plus-এর শক্তি তার বিশাল বাজার, জনসংখ্যা, উৎপাদনক্ষমতা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতিতে।
ফলে ২০২৬-এর বিশ্বে প্রশ্নটি হয়তো আর সরাসরি ‘G7 না BRICS—কে শক্তিশালী?’ নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, এককেন্দ্রিক পশ্চিমী আধিপত্যের পাশাপাশি কি সত্যিই একটি বহুমেরু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে?
নয়াদিল্লিতে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে আসতে পারে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতির পুরনো ভারসাম্যও তত দ্রুত বদলাতে পারে। তবে G7-এর প্রযুক্তি, আর্থিক বাজার এবং ডলারের প্রভাব এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী—তাই BRICS-এর উত্থানকে পশ্চিমী শক্তির অবসান হিসেবে দেখার সময় এখনও আসেনি।
বরং বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্বের শক্তির কেন্দ্র এক জায়গায় না থেকে ধীরে ধীরে একাধিক কেন্দ্রের দিকে সরে যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে দিল্লির BRICS সম্মেলন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments