Homeখেলাচার আন্তর্জাতিক সোনার পদক, তবু চাকরি নেই! পেট চালাতে সবজি বিক্রি অমরদীপের, ফাঁকে চালান ঋণের ট্যাক্সিও

চার আন্তর্জাতিক সোনার পদক, তবু চাকরি নেই! পেট চালাতে সবজি বিক্রি অমরদীপের, ফাঁকে চালান ঋণের ট্যাক্সিও

নিউজ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের জার্সি গায়ে একের পর এক সাফল্য। দেশের হয়ে জিতেছেন চারটি সোনার পদক। ক্রীড়াজীবনের প্রায়
ChatGPT Image Sep 3, 2026, 02_55_25 PM

নিউজ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের জার্সি গায়ে একের পর এক সাফল্য। দেশের হয়ে জিতেছেন চারটি সোনার পদক। ক্রীড়াজীবনের প্রায় ন’বছর ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যে পদকের স্বপ্ন দেখেন অসংখ্য ক্রীড়াবিদ, সেই সোনা চার বার ঘরে এনেছেন ঝাড়খণ্ডের অমরদীপ কুমার। অথচ আজ তাঁর পরিচয় আন্তর্জাতিক পদকজয়ী খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং রাঁচির আরগোড়া চকে সবজি বিক্রেতা হিসেবে!

এক সময় দেশের হয়ে পদক জেতাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এখনও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সময় পেলেই স্টেডিয়ামে গিয়ে অনুশীলন করেন অমরদীপ। আরও একটি আন্তর্জাতিক পদক জেতার ইচ্ছা তাঁর মনে এখনও প্রবল। কিন্তু তার আগে লড়াইটা পেটের সঙ্গে। সংসার চালাতে কখনও সবজি বিক্রি করছেন, কখনও আবার ঋণ নিয়ে কেনা ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। আর তাঁর সেই ছোট্ট সবজির দোকানেই ঝুলছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন—দেশের হয়ে জেতা সোনার পদকগুলি।

ন’বছরে চার আন্তর্জাতিক সাফল্য

রাঁচির বাসিন্দা অমরদীপ কুমার থ্রো-বল খেলোয়াড়। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের হয়ে একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে চারটি আন্তর্জাতিক সোনার পদক। অর্থাৎ, দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনে দেশের হয়ে সাফল্যের যে নজির তিনি তৈরি করেছেন, তা নিছক সাধারণ কোনও অর্জন নয়।

একটি আন্তর্জাতিক পদক জেতার জন্য বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেন খেলোয়াড়েরা। অনুশীলন, ভ্রমণ, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে ক্রীড়াজীবনে চলে একটানা লড়াই। সেই লড়াইয়ের ফল হিসেবে অমরদীপের ঘরে এসেছে চারটি সোনা। কিন্তু পদকের সেই সাফল্য তাঁর জীবনে আর্থিক নিশ্চয়তা এনে দিতে পারেনি বলেই তাঁর অভিযোগ।

অমরদীপের দাবি, এত আন্তর্জাতিক সাফল্যের পরেও তিনি এখনও কোনও সরকারি চাকরি পাননি। এমনকি তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের তরফে এমন কোনও উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তাও তিনি পাননি, যা দিয়ে নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ কিছুটা নিশ্চিত করতে পারতেন।

চাকরির আশায় দরজায় দরজায়, শেষে সবজির দোকান

ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যের পর সরকারি চাকরির সুযোগ মিলবে—এই আশাই অনেক খেলোয়াড়কে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়। অমরদীপের ক্ষেত্রেও সেই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, চাকরির আশায় বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও এখনও নিয়োগপত্র হাতে পাননি তিনি।

ফলে বাধ্য হয়ে জীবিকার অন্য পথ বেছে নিতে হয়েছে তাঁকে। রাঁচির আরগোড়া চকে এখন সবজি বিক্রি করেন অমরদীপ। সকাল থেকে বা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর দোকানে সাজানো থাকে বিভিন্ন ধরনের সবজি। আর সেই দোকানেরই এক পাশে ঝুলতে দেখা যায় তাঁর আন্তর্জাতিক পদকগুলি।

দৃশ্যটি যেন তাঁর জীবনের দুই বিপরীত ছবিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেয়। একদিকে দেশের হয়ে জেতা সোনার পদক, অন্যদিকে সংসারের খরচ চালাতে সবজি বিক্রি। যে হাতে একদিন দেশের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কার উঠেছিল, সেই হাতেই এখন ক্রেতাদের জন্য সবজি মাপতে হয়।

ঋণ নিয়ে ট্যাক্সি, বুকিং না থাকলেই সবজির দোকান

শুধু সবজি বিক্রি করেই অবশ্য সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন না অমরদীপ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণ নিয়ে একটি ট্যাক্সি কিনেছেন তিনি। যখন ট্যাক্সির বুকিং থাকে, তখন রাস্তায় বেরিয়ে গাড়ি চালান। আর যখন কোনও বুকিং থাকে না, তখন ফিরে আসেন আরগোড়া চকের সবজির দোকানে।

অর্থাৎ, জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রতিদিনই তাঁকে নতুন করে লড়াই করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্তরের একজন পদকজয়ী ক্রীড়াবিদের কাছে পরিস্থিতিটি নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে অমরদীপের কথায় সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে হতাশার পাশাপাশি অভিমানও। দেশের হয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার পরেও কেন তাঁর মতো খেলোয়াড়কে জীবিকার জন্য এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—সেই প্রশ্নই বারবার উঠছে।

পদক ঝুলছে দোকানে, তবু থামেনি স্বপ্ন

অমরদীপের সবজির দোকানে ঝোলানো তাঁর সোনার পদকগুলি এখন তাঁর জীবনের এক অদ্ভুত প্রতীক হয়ে উঠেছে। পদকগুলি শুধু তাঁর অতীত সাফল্যের স্মারক নয়, বরং তাঁর বর্তমান পরিস্থিতির কথাও মনে করিয়ে দেয়।

ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়ার পরেও যদি কোনও খেলোয়াড়কে জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশার উপর নির্ভর করতে হয়, তা হলে ক্রীড়াবিদদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের হয়ে পদকজয়ীদের ক্ষেত্রে পুরস্কার, চাকরি, আর্থিক সহায়তা কিংবা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

অমরদীপের ক্ষেত্রে তাঁর অভিযোগের সত্যতা এবং সরকারি নীতির আওতায় তিনি কী কী সুযোগ পাওয়ার যোগ্য, তা প্রশাসনিক ভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তাঁর বর্তমান পরিস্থিতির ছবিটি নিঃসন্দেহে আলোড়ন তৈরি করার মতো।

সব কিছুর পরেও অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা চাকরি না পাওয়ার হতাশা তাঁকে এখনও খেলা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি। সুযোগ পেলেই তিনি অনুশীলনে ফেরেন। স্টেডিয়ামে গিয়ে নিজের ফিটনেস এবং খেলার প্রস্তুতি চালিয়ে যান।

অমরদীপের লক্ষ্য এখনও একই—দেশের হয়ে আরও একটি সোনার পদক জয় করা। সংসার চালানোর জন্য একদিকে সবজি বিক্রি, অন্যদিকে ট্যাক্সি চালানো; তার মাঝেই সময় বের করে ক্রীড়াক্ষেত্রে ফেরার প্রস্তুতি। জীবনের এই দ্বন্দ্বের মধ্যেও তাঁর স্বপ্ন যে এখনও বেঁচে রয়েছে, সেটিই হয়তো এই গল্পের সবচেয়ে বড় দিক।

চারটি আন্তর্জাতিক সোনার পদক জেতার পরেও সরকারি চাকরির অপেক্ষা শেষ হয়নি। রাঁচির রাস্তায় সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে, ঋণের ট্যাক্সি চালাতে হচ্ছে। কিন্তু দোকানে ঝোলানো পদকগুলির দিকে তাকিয়েই হয়তো অমরদীপ নিজেকে মনে করিয়ে দেন—তিনি একদিন দেশের হয়ে জিতেছিলেন, এবং সুযোগ পেলে আবারও জিততে পারেন।

এখন প্রশ্ন একটাই—আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা এমন খেলোয়াড়দের সাফল্যের পরে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? অমরদীপের কাহিনি সেই প্রশ্নই আরও একবার সামনে এনে দিল।


No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved