নিউজ ডেস্ক: পৃথিবীকে আমরা যে মানচিত্রে এত দিন দেখে এসেছি, তার চেহারা কি এবার বদলাতে চলেছে? নতুন একটি মানচিত্রকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা। প্রায় পাঁচ শতক ধরে ব্যবহৃত ‘মার্কেটর প্রোজেকশন’-এর বদলে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডকে তুলনামূলক ভাবে সঠিক আয়তনে দেখানোর লক্ষ্যে তৈরি ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ সামনে এসেছে। এই নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা ও ভারতকে তুলনামূলক ভাবে বড় দেখাবে। উল্টো দিকে ছোট দেখাতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড এবং রাশিয়ার মতো উত্তর গোলার্ধের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
তবে বিষয়টি শুধুই ভূগোলের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। কোনও মানচিত্রে একটি দেশের সীমানা কী ভাবে দেখানো হচ্ছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সংবেদনশীলতাও। আর সেই কারণেই নতুন মানচিত্র নিয়ে ইতিমধ্যেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ভারত। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখের সীমানা কী ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট এবং আপসহীন।
প্রশ্ন উঠছে, কেন হঠাৎ মানচিত্র বদলের প্রয়োজন পড়ল? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ‘মার্কেটর প্রোজেকশন’-এর ইতিহাসে।
প্রায় ৫০০ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভূগোলের পাঠ থেকে শুরু করে নৌ-পরিবহণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই মানচিত্রের ব্যবহার হয়ে এসেছে। ষোড়শ শতকে ফ্লেমিশ-জার্মান ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এই প্রক্ষেপণ তৈরি করেন। পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে দেখানোর সময় তিনি মূলত দিক এবং কোণ ঠিক রাখার উপর জোর দিয়েছিলেন। সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে সেটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এর একটি বড় সমস্যা ছিল আয়তনের ক্ষেত্রে। গোলাকার পৃথিবীকে দ্বিমাত্রিক কাগজে তুলে ধরতে গিয়ে বিশেষ করে মেরুর কাছাকাছি থাকা অঞ্চলগুলি বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় হয়ে দেখা যায়। বিপরীতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলি তুলনামূলক ভাবে ছোট দেখায়।
এই কারণেই মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান বিশাল মনে হয়। অথচ বাস্তব আয়তনের হিসাব বলছে, আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়। অর্থাৎ মানচিত্রে চোখে দেখা আকার এবং বাস্তব ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলের মধ্যে রয়েছে বিশাল ফারাক।
এই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ। ২০১৮ সালে বোয়ান সাভরিচ, টম প্যাটারসন এবং বার্নহার্ড জেনি মিলে এই প্রক্ষেপণ তৈরি করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতলে তুলে ধরলেও বিভিন্ন মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তনের পার্থক্য যতটা সম্ভব সঠিক ভাবে দেখানো।
নতুন মানচিত্রে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এত দিন যে দেশ বা মহাদেশগুলি মানচিত্রে অস্বাভাবিক বড় বলে মনে হত, সেগুলি তুলনায় ছোট হয়ে আসবে। আবার আফ্রিকা, ভারত-সহ বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা অঞ্চলগুলির প্রকৃত আয়তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চেহারা ফুটে উঠবে।
ফলে নতুন মানচিত্রে আফ্রিকার আকার যে কোনও ধারণার তুলনায় অনেক বড় বলে মনে হতে পারে। এমনকি রাশিয়ার প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের আফ্রিকা একটি বিশাল ভূখণ্ড হিসেবে সামনে আসবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, ভারত এবং ইউরোপের বড় অংশকেও আফ্রিকার ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে তুলনা করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, নতুন মানচিত্রে ভারত ‘বড়’ হয়ে যাবে—এমনটা বাস্তবে নয়। ভারতের ভৌগোলিক আয়তন একটুও বদলাবে না। বদলাবে শুধু পৃথিবীর সমতল মানচিত্রে তার দৃশ্যমান আকার। একই ভাবে আমেরিকা বা গ্রিনল্যান্ড বাস্তবে ছোট হয়ে যাচ্ছে না। মানচিত্রের প্রক্ষেপণ বদলানোর ফলে তাদের আকার তুলনামূলক ভাবে ছোট দেখাবে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
ভারতের কাছে মানচিত্রের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখকে কোন দেশের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বিতর্ক রয়েছে। ১৯৪৭-৪৮ সালের সংঘাতের পর কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্য দিকে ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর লাদাখের বিস্তীর্ণ অঞ্চল চিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে ভারতের দাবি।
এই পরিস্থিতিতে কোনও আন্তর্জাতিক মানচিত্রে ওই অঞ্চলগুলিকে কী ভাবে দেখানো হবে, সেটি নয়াদিল্লির কাছে শুধুমাত্র মানচিত্রের বিষয় নয়—সরাসরি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
এই কারণেই নতুন মানচিত্র প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সতর্ক অবস্থান জানিয়েছে বলে আপনার দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবালের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র বা প্রক্ষেপণকে সমর্থন করাই ভারতের নীতি নয়। কিন্তু ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ-সহ দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডকে দেখানোই নয়াদিল্লির অবস্থান।
অর্থাৎ, পৃথিবীর আয়তনকে আরও বাস্তবসম্মত ভাবে দেখানোর চেষ্টা ভারত নীতিগত ভাবে সমর্থন করলেও, সেই মানচিত্রে ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত অবস্থান বা সরকারি সীমান্তের কোনও পরিবর্তন মেনে নেওয়া হবে না—এই বার্তাই স্পষ্ট।
নতুন মানচিত্রের পক্ষে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ভারত-সহ বিপুল সংখ্যক দেশ ভোট দিয়েছে বলেও আপনার দেওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে। সেখানে অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ছিল। কয়েকটি দেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে এবং আমেরিকা এর বিরোধিতা করেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
আমেরিকার আপত্তির পিছনেও রয়েছে অন্য যুক্তি। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির বদলে মানচিত্রের প্রক্ষেপণ নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
যুক্তিটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ মানচিত্র কখনওই শুধু ভূগোলের ছবি নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মানচিত্রকে রাজনৈতিক ক্ষমতা, উপনিবেশ বিস্তার এবং ভূখণ্ডের দাবির হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করা হয়েছে। কোন এলাকা কোন দেশের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, তা নিয়ে এখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধ রয়েছে।
তাই ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ পৃথিবীর দেশগুলির প্রকৃত আয়তনের তুলনা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত করলেও, সীমান্ত-বিতর্কের সমাধান করতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—নতুন মানচিত্রে ভারতের বাস্তব আয়তন বাড়ছে না। বরং এত দিন ব্যবহৃত মানচিত্রে যে বিকৃতি ছিল, তা কমলে ভারত এবং আফ্রিকার মতো দেশগুলি তুলনামূলক ভাবে নিজেদের প্রকৃত ভৌগোলিক গুরুত্বের কাছাকাছি আকারে দেখা যাবে।
তাই আগামী দিনে পৃথিবীর মানচিত্রে ভারতকে যদি আরও বড় দেখায়, তা কোনও নতুন ভূখণ্ড পাওয়ার ফল নয়। সেটি হবে কাগজের উপর পৃথিবীকে আরও বাস্তবসম্মত ভাবে তুলে ধরার ফল। কিন্তু সীমান্তের রেখা কোথায় টানা হবে, আর কোন ভূখণ্ডকে কোন দেশের অংশ হিসেবে দেখানো হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও ভূগোলের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করছে রাজনীতি ও কূটনীতির উপর।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments