Homeজলপাইগুড়িজলপাইগুড়ি মেডিক্যাল কলেজে ‘পরিষেবা’র নামে টাকা চাওয়ার অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস কর্তৃপক্ষের

জলপাইগুড়ি মেডিক্যাল কলেজে ‘পরিষেবা’র নামে টাকা চাওয়ার অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস কর্তৃপক্ষের

resizeplus_Screenshot 2026-09-04 125920_edited

নিউজ ডেস্ক; অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে লিফটে ওঠানো-নামানোর জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। সদ্যোজাতকে আত্মীয়দের দেখানোর জন্য ১০০ টাকা। সন্তান জন্মের পর সদ্য মা হওয়া মহিলাকে ওয়ার্ডে পৌঁছে দিতে আরও ২০০ টাকা। সরকারি হাসপাতালের কোনও নির্ধারিত মূল্যতালিকা নয়, অথচ অভিযোগ উঠছে এমনই এক অলিখিত ‘রেট চার্ট’-এর। জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাবে চিকিৎসার পাশাপাশি নানা ধরনের পরিষেবার জন্য রোগীর পরিবারের কাছ থেকে টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

রোগী ভর্তি হওয়ার পর থেকে সন্তান জন্ম এবং হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ধাপে ধাপে টাকা দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন একাধিক রোগীর আত্মীয়। অভিযোগ, টাকা দিতে অস্বীকার করলে স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ রোগীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না। এমনকি টাকা না দিলে রোগীকে ছুঁয়েও দেখা হয় না বলেও অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার ফের এই ধরনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় হাসপাতালের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মা ও শিশুদের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে জলপাইগুড়িতে তৈরি হয়েছে পাঁচতলা মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব। ৪০০ শয্যার এই কেন্দ্রে জলপাইগুড়ি ছাড়াও কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ারের একাংশের প্রসূতিরা সন্তান প্রসবের জন্য আসেন। উত্তরবঙ্গের বহু পরিবারের কাছে এই হাসপাতাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে নিরাপদে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে নিয়ে যাওয়া, প্রসূতির পরিচর্যা এবং সদ্যোজাতকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো পরিষেবাও অত্যন্ত জরুরি।

রোগীর আত্মীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ধাপে টাকা চাওয়া শুরু হয়। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে লিফটে করে উপরের তলায় নিয়ে যাওয়া, অপারেশন থিয়েটারে পৌঁছে দেওয়া, অস্ত্রোপচারের পর ওয়ার্ডে নিয়ে আসা—প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা করে টাকা দাবি করা হচ্ছে। সদ্যোজাতকে পরিবারের সদস্যদের দেখানোর ক্ষেত্রেও টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা আর্থিক ভাবে দুর্বল পরিবারগুলি আরও সমস্যায় পড়ছেন।

এক প্রসূতির স্বামী একরামুল হক জানান, তাঁর স্ত্রী বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার আগে পোশাক বদলানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্যও এক স্বাস্থ্যকর্মী তাঁর কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর। একরামুলের বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছেন তাঁরা। চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ সামলাতেই যখন পরিবারের উপর চাপ রয়েছে, তখন প্রতিটি পরিষেবার জন্য আলাদা করে টাকা চাওয়া অত্যন্ত দুর্ভোগের।

আর এক রোগীর আত্মীয় রতন বর্মনের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর অভিযোগ, স্ত্রীকে লিফটে করে ওঠানো-নামানোর জন্য টাকা দিতে হয়েছে। রতনের কথায়, তাঁদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। সেই কারণেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। কিন্তু হাসপাতালের ভিতরে যদি প্রতিটি পদক্ষেপে টাকা দিতে হয়, তা হলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

রোগীর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, কোনও পরিষেবার জন্য সরকারি ভাবে নির্ধারিত ফি থাকলে তা লিখিত ভাবে প্রকাশ করা উচিত। হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় পরিষেবার মূল্যতালিকা টাঙানো থাকলে রোগী ও তাঁদের আত্মীয়েরা বুঝতে পারবেন কোন পরিষেবা বিনামূল্যে এবং কোনটির জন্য টাকা দিতে হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এখানে কোনও রসিদ ছাড়াই মৌখিক ভাবে টাকা চাওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকেই প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, টাকা দিতে অস্বীকার করলে রোগীর চিকিৎসা বা স্থানান্তরের কাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এর আগে একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা জারি করেছিল। স্বাস্থ্যকর্মীদের অনিয়ম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পরেও ফের অভিযোগ ওঠায় হাসপাতালের নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু বিজ্ঞপ্তি জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন রোগীর আত্মীয়েরা।

বিষয়টি নিয়ে জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের এমএসভিপি কল্যাণ খাঁ জানিয়েছেন, অভিযোগ তাঁর কাছে এসেছে। তবে অভিযোগগুলি মৌখিক ভাবে করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য কড়া নজরদারি রাখা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের পর এখন নজর রয়েছে তদন্তের দিকে। অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে কোনও কমিটি গঠন করা হবে কি না, অভিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে কি না এবং ভবিষ্যতে রোগী ও তাঁদের আত্মীয়দের কাছ থেকে অননুমোদিত ভাবে টাকা নেওয়া বন্ধ করতে কী ব্যবস্থা করা হবে—সেই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

প্রসূতি ও সদ্যোজাতদের ক্ষেত্রে সময়মতো পরিষেবা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসবের আগে বা পরে রোগীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সময় সামান্য দেরিও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই লিফটে ওঠানো, ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়া বা পরিচর্যার মতো পরিষেবা নিয়ে টাকা চাওয়ার অভিযোগ শুধু আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয়, রোগীর নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে রোগীর পরিবারের অভিযোগ জানানোর জন্য পৃথক হেল্পলাইন, অভিযোগ বাক্স এবং নজরদারি ব্যবস্থা আরও সক্রিয় করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের কর্মীদের পরিচয়পত্র, দায়িত্ব এবং পরিষেবার নিয়ম স্পষ্ট ভাবে জানানো প্রয়োজন বলেও মনে করছেন অনেকে।

জলপাইগুড়ির মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাবে প্রতিদিন বহু প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের অধিকাংশই সরকারি পরিষেবার উপর নির্ভরশীল। সেই জায়গায় চিকিৎসার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠলে হাসপাতালের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কর্তৃপক্ষের আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার দিকেই তাকিয়ে রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved