
নিউজ ডেস্ক : ট্রেনের গতি ও পরিচালন ব্যবস্থাকে আরও মসৃণ করতে বড় পদক্ষেপ পূর্ব রেলের মালদহ ডিভিশনের। লাইনের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, ট্রেন চলাচলে আরও বেশি নমনীয়তা আনা এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থাকে আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে বিন্দুবাসিনীতে সফল ভাবে চালু করা হল অষ্টম Intermediate Block Signalling বা IBS। রেলের দাবি, এই নতুন ব্যবস্থার ফলে একটি দীর্ঘ ব্লক সেকশনকে ছোট অংশে ভাগ করে আরও দক্ষতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে গোটা কাজ। রেলের তরফে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত সকাল ১০টা ২০ মিনিট থেকে দুপুর ৩টে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত SI-4 সময়সীমার মধ্যেই IBS চালুর যাবতীয় প্রযুক্তিগত কাজ শেষ করা হয়েছে। মালদহ ডিভিশনের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার মনীশ কুমার গুপ্তের নির্দেশনায় ‘টিম মালদহ’-এর পরিকল্পিত উদ্যোগেই এই কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
রেলের Signal & Telecommunication (S&T), Operating এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে সমন্বয় ও পরিকল্পিত কাজই এই প্রকল্প সফল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বিন্দুবাসিনীতে IBS চালুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে চলেছে ট্রেন পরিচালনায়। আগে ওই এলাকায় প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্লক সেকশন ছিল। নতুন IBS ব্যবস্থায় সেই দীর্ঘ অংশটিকে প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার করে দুটি ছোট ব্লক সেকশনে ভাগ করা হয়েছে।
এর ফলে একটি ট্রেন ওই অংশের সম্পূর্ণ ৯ কিলোমিটার অতিক্রম না করা পর্যন্ত পরবর্তী ট্রেনকে অপেক্ষা করতে হবে—এমন পরিস্থিতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ ট্রেনের ব্যবধান আরও কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। লাইনের সামগ্রিক ধারণক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশেষ করে ব্যস্ত রেলপথে ব্লক সেকশনের দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনা হলে একাধিক ট্রেনকে আরও পরিকল্পিত ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়। ফলে ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে অপারেটিং বিভাগের হাতে অতিরিক্ত নমনীয়তা আসে। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার সুফল যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী—দুই ধরনের ট্রেন চলাচলেই পাওয়া যেতে পারে বলে রেলের দাবি।
IBS চালুর জন্য শুধু সিগন্যাল বসানোতেই কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট একাধিক ইন্টারলকিং ব্যবস্থাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়েছে।
রেলের তথ্য অনুযায়ী, IB পরিষেবার উপযোগী করে বনিডাঙায় Siemens Westrace MK-I Electronic Interlocking (EI)-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই ভাবে তিলডাঙায় Panel Interlocking (PI) এবং Level Crossing Gate No. 63-এর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরীক্ষার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। Non-Interlocking (NI) বাতিল করার আগে সমস্ত সিগন্যালের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি পয়েন্টগুলির correspondence testing-ও সম্পন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় সিগন্যাল, পয়েন্ট এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি সঠিক ভাবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করেই পরবর্তী ধাপে এগোনো হয়েছে।
নতুন সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করার পর শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন করলেই হবে না, সেই ব্যবস্থার সঙ্গে অপারেটিং কর্মীদেরও সম্পূর্ণ ভাবে পরিচিত করে তোলা জরুরি। সেই কারণেই নতুন IBS ব্যবস্থা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অপারেটিং কর্মীদের কাউন্সেলিং শুরু হয়েছে।
Operating Officers এবং Supervisors-এর মাধ্যমে এই কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। রেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অন্তত এক সপ্তাহ ধরে এই প্রশিক্ষণ বা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া চলবে। নতুন IBS ব্যবস্থায় ট্রেন পরিচালনার নিয়ম, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে কর্মীদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
বিন্দুবাসিনীতে IBS চালুর পাশাপাশি পুরনো সিগন্যালিং পরিকাঠামো আধুনিকীকরণের কাজও করা হয়েছে। এত দিন ব্যবহৃত Double Line Block Instrument বা DLBI-এর পরিবর্তে নতুন প্রযুক্তির Single Line Block Panel with Axle Counter-Digital বা SSBPAC(D) বসানো হয়েছে।
রেলের তরফে জানানো হয়েছে, বনিডাঙা–তিলডাঙা এবং বনিডাঙা–বনিডাঙা লিঙ্ক কেবিন—এই দুই সেকশনেই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
নতুন প্রযুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর যোগাযোগ ব্যবস্থায় দ্বৈত রিডানড্যান্সি। রেলের দাবি, এই ধরনের dual-redundant communication system ব্যবহার করার ফলে সিগন্যালিং ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়বে। কোনও একটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিষেবা সচল রাখার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে।
বিন্দুবাসিনীর IBS প্রকল্পকে ঘিরে আরও একাধিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে Dual UFSBI MUX, SSBPAC(D), Remote Terminal Unit বা RTU এবং Dual Multi-Section Digital Axle Counter বা MSDAC।
এর পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে Earth Leakage Detector (ELD), Fuse Auto Changeover for RT, Aspiration-type Fire Alarm and Smoke Detection System, STM-4 এবং Ring Earth System-এর মতো সরঞ্জাম।
অর্থাৎ শুধু ট্রেনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ নয়, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত নিরাপত্তা, অগ্নি শনাক্তকরণ, যোগাযোগ এবং সিগন্যালিং পরিকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা—একাধিক দিককে মাথায় রেখেই আধুনিকীকরণ করা হয়েছে।
পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝির বক্তব্য অনুযায়ী, বিন্দুবাসিনীতে IBS চালু হওয়া মালদহ ডিভিশনের সিগন্যালিং নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
রেলের আশা, নতুন ব্যবস্থার ফলে ট্রেন পরিচালনার দক্ষতা বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল আরও পরিকল্পিত ভাবে পরিচালনা করা যাবে। দীর্ঘমেয়াদে রেলপথের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে মালদহ ডিভিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ট্রেনের সংখ্যা এবং পরিষেবার চাপ সামলাতে সিগন্যালিং পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন IBS ব্যবস্থা সেই লক্ষ্যেই আরও একটি ধাপ বলে মনে করছে পূর্ব রেল।
সব মিলিয়ে, বিন্দুবাসিনীতে অষ্টম IBS চালুর সঙ্গে মালদহ ডিভিশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণের নতুন অধ্যায় শুরু হল। দীর্ঘ ব্লক সেকশনকে ছোট অংশে ভাগ করা থেকে শুরু করে আধুনিক অ্যাক্সেল কাউন্টার, ইন্টারলকিং এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে ট্রেন চলাচলকে আরও নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ করে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments