Homeমালদামানিকচকএক বছরের মধ্যেই ভুতনির বাঁধে ধস, গঙ্গার জল ঢুকছে গ্রামে, শুরু রাজনৈতিক চাপানউতোর

এক বছরের মধ্যেই ভুতনির বাঁধে ধস, গঙ্গার জল ঢুকছে গ্রামে, শুরু রাজনৈতিক চাপানউতোর

নিউজ ডেস্ক; গঙ্গার জলস্তর ও স্রোতের চাপে ভেঙে গেল মালদহের মানিকচক বিধানসভার অন্তর্গত ভুতনি থানার কেশরপুর কানুটনটোলা এলাকার বাঁধ। বৃহস্পতিবার
resizeplus_Screenshot 2026-09-04 135833_edited

নিউজ ডেস্ক; গঙ্গার জলস্তর ও স্রোতের চাপে ভেঙে গেল মালদহের মানিকচক বিধানসভার অন্তর্গত ভুতনি থানার কেশরপুর কানুটনটোলা এলাকার বাঁধ। বৃহস্পতিবার ভোরে বাঁধের একটি অংশে ভাঙন শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় ১০০ মিটার অংশ নদীগর্ভে চলে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। বাঁধ ভাঙার পর গঙ্গার জল হু হু করে আশপাশের অসংরক্ষিত এলাকায় ঢুকতে শুরু করে। ইতিমধ্যেই ওই এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

মাত্র এক বছর আগে তৈরি হওয়া বাঁধ এত দ্রুত কী ভাবে ভেঙে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাঁধ নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, পরিকল্পনার অভাব এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে বিরোধীরা। অন্যদিকে, তৃণমূলের দাবি, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হচ্ছে। ফলে ভুতনির বাঁধ ভাঙনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, বৃহস্পতিবার সাতসকালে কেশরপুর কানুটনটোলা এলাকায় বাঁধের মাটিতে ফাটল দেখা যায়। প্রথমে ছোট অংশে ভাঙন হলেও গঙ্গার জলের প্রবল চাপের কারণে ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় ১০০ মিটার বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর নদীর জল দ্রুত আশপাশের নিচু ও অসংরক্ষিত এলাকায় ঢুকতে শুরু করে। বহু জায়গায় চাষের জমি ও বসতবাড়ির আশপাশে জল জমে যায়।

বাঁধ ভাঙার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে যান মানিকচকের বিজেপি বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল। তিনি বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালে মাটির সঙ্গে বালি মিশিয়ে অপরিকল্পিত ভাবে বাঁধটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ১,৮০০ মিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণে সেচ দপ্তরের প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। বিধায়কের অভিযোগ, নির্মাণের মাত্র এক বছরের মধ্যে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ ফের বিপদের মুখে পড়েছেন।

গৌড়চন্দ্র মণ্ডলের বক্তব্য, নদী বাঁধ নির্মাণের নামে দীর্ঘদিন ধরে কাটমানি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বাঁধ নির্মাণের গুণমান, ব্যবহৃত মাটি, নকশা এবং কাজের দায়িত্বে থাকা সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে না দেখলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাঁধ তৈরির কাজে যুক্ত একটি ঠিকাদার সংস্থার কর্তা অবশ্য অন্য বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, গত বছর জুলাই মাসে বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ অর্থের ১০ শতাংশ হারে তাঁদের ডিপোজিট রাখতে হয়েছিল। বাঁধটির কার্যকর মেয়াদ ছিল ছয় মাস। সেই মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে বাঁধের কী পরিস্থিতি, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারবেন না বলেও জানান।

বিরোধীদের পাশাপাশি সিপিএমও বাঁধ ভাঙনের ঘটনায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দেবজ্যোতি সিনহার অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে চরম অনিয়ম হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, একসময় বলা হয়েছিল ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার ক্ষমতায় এলে আর নদীভাঙন হবে না। কিন্তু ফের ভুতনিতে বাঁধ ভাঙার ঘটনায় সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

তৃণমূল বিধায়ক আব্দুর রহিম বক্সি অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ খারিজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানিকচকে এসে স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই কাজ কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অথচ এখন কোনও নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই তৃণমূলকে দায়ী করে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হচ্ছে।

বাঁধ ভাঙায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেশরপুর এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল শেখ এবং মানিক মণ্ডলের কথায়, গত বছর তৈরি হওয়া বাঁধ এ ভাবে ভেঙে যাওয়ায় তাঁরা আতঙ্কিত। তাঁদের আশঙ্কা, ফের বড় বন্যা হলে ঘরবাড়ি, জমি এবং গবাদি পশু নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নতুন বাঁধ তৈরি করেও যদি তা এক বছরের মধ্যে ভেঙে যায়, তা হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না বলেই মনে করছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের দাবি, আপৎকালীন ভিত্তিতে ভাঙন আটকানোর কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা, ত্রাণ ও পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চাষের জমি প্লাবিত হলে কৃষকদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করতে হবে বলে দাবি উঠেছে।

প্রশাসনের তরফে এখনও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব বা পুনর্নির্মাণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। তবে বাঁধ ভাঙনের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীর জলস্তর, স্রোতের গতি এবং ভাঙনের পরিধির উপর নজর রাখা জরুরি। শুধু অস্থায়ী ভাবে মাটি ফেলে বাঁধ মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে নদীভাঙন রোধের কাজ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ভুতনির বাঁধ ভাঙনের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন, নির্মাণের সময় কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল, কাজের মান যাচাই হয়েছিল কি না এবং বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার ছিল। এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখে দায় নির্ধারণ করা না হলে ভবিষ্যতে একই বিপর্যয় ফের ঘটতে পারে। আপাতত নদীর জল ঢুকে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কেশরপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষ। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক দোষারোপ নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved