
নিউজ ডেস্ক :নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান এবং পাহাড়ি দুর্যোগের পর এ বার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে। ভুটান পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হলেই মুহূর্তের মধ্যে জল নেমে আসতে পারে সমতলে। সেই আশঙ্কাতেই জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার ভুটান সীমান্তবর্তী পাহাড়ি নদীগুলিতে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে সেচ দফতর। বর্ষার মরশুম পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এবং পর্যটকদের নদীতে নামার ক্ষেত্রে কড়া নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সেচ দফতর সূত্রে খবর, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার—এই দুই জেলা মিলিয়ে প্রায় ৭৪টি নদী রয়েছে, যেগুলির অনেকগুলিরই জলধারার সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে ভুটানের পাহাড়ি এলাকার। ফলে উজানে অতিবৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে ডুয়ার্সের সমতলে। পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে জলের পরিমাণ আচমকা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ নদীর তুলনায় বিপদের মাত্রাও অনেক বেশি। নদীর জল স্বাভাবিক দেখালেও কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
এই কারণেই প্রশাসনের নজরে রয়েছে নদী তীরবর্তী একাধিক এলাকা। বিশেষ করে জলপাইগুড়ির বানারহাট, নাগরাকাটা ও মেটেলি এবং আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাট, বীরপাড়া, কুমারগ্রাম, ফালাকাটা ও কালচিনি ব্লককে বাড়তি নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও নদী, নদীর চর কিংবা জলপ্রবাহের কাছে না যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
পাহাড়ি নদীর চরিত্র সমতলের নদীর থেকে একেবারেই আলাদা। ভুটান পাহাড়ের কোনও এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে অত্যধিক বৃষ্টি হলে সেই জল দ্রুত নীচের দিকে নেমে আসে। পথে ছোট নদী, খাল কিংবা নালাগুলির জল একসঙ্গে মিশে গেলে নদীর স্রোত কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এই আকস্মিক জলস্রোতই অনেক সময় হড়পা বানের রূপ নেয়।
সেচ দফতরের উত্তর-পূর্ব বিভাগের চিফ ইঞ্জিনিয়ার কৃষ্ণেন্দু ভৌমিকের বক্তব্য অনুযায়ী, সিকিম পাহাড়ে বৃষ্টি হলে তিস্তা নদী দিয়ে জল সমতলে পৌঁছতে কিছুটা সময় নেয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু ভুটান পাহাড়ের ক্ষেত্রে জল দ্রুত নেমে আসায় সেই সময় অনেক কম। ফলে পাহাড়ে বৃষ্টির খবর পাওয়া এবং সমতলে বিপজ্জনক জলস্রোত পৌঁছনোর মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য হতে পারে।
এই কারণেই নদীর জল দেখে নিরাপদ মনে করে সেখানে নামা বিপজ্জনক বলে মনে করছেন প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
ডুয়ার্সে হড়পা বান কোনও নতুন ঘটনা নয়। পাহাড়ি নদীতে আচমকা জল বাড়ার কারণে অতীতে একাধিক বার প্রাণহানি হয়েছে। ২০২২ সালে মাল নদীতে বিসর্জনের সময় আচমকা জলস্রোত নেমে এসে বড় দুর্ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় আট জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই বর্ষাকালে পাহাড়ি নদীগুলির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা নিয়ে আসছে প্রশাসন।
চলতি বছরও গাঠিয়া নদীতে স্নান করতে গিয়ে হড়পা বানের স্রোতে দু’জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ফলে এ বার ভুটান পাহাড়ে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার খবর সামনে আসতেই ফের সতর্ক হয়েছে প্রশাসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদ হল এর আকস্মিকতা। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও উজানের বৃষ্টির কারণে নীচের দিকে নদীর জল আচমকা বাড়তে পারে। ফলে নদীর পাড়ে থাকা মানুষ অনেক সময় বিপদ বুঝে ওঠার আগেই প্রবল স্রোতের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
বিশিষ্ট ভূগোলবিদ জাতীশ্বর ভারতীও পাহাড়ি নদীর এই আচরণ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, হড়পা বান অত্যন্ত দ্রুত এবং অনেক সময় প্রায় নিঃশব্দেই আছড়ে পড়তে পারে। তাই বর্ষার সময়ে পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক চেহারা দেখে সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে পর্যটকদের মধ্যে পাহাড়ি নদীতে স্নান করা, নদীর ধারে বসে ছবি তোলা কিংবা মাছ ধরার প্রবণতা দেখা যায়। বর্ষার সময় এই ধরনের কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর স্রোত বদলে গেলে নিরাপদ জায়গায় ফিরে আসার সুযোগও নাও মিলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হল কোনও রকম প্রাণহানি এড়ানো। সেই কারণে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং নদী সংলগ্ন এলাকায় যাতায়াতকারীদের নদীতে না নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীতে স্নান করা, মাছ ধরা কিংবা জলপথে পারাপার—সবই এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বর্ষা পুরোপুরি বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত নদীগুলির পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় স্তরে সতর্কবার্তা দেওয়া হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হতে পারে।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ও দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কত দ্রুত ভয়াবহ আকার নিতে পারে। তাই ভুটান পাহাড়ে বৃষ্টির সময় ডুয়ার্সের নদীগুলিকে ঘিরে বাড়তি সতর্কতা নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং সম্ভাব্য বিপদ এড়ানোর আগাম প্রস্তুতি বলেই মনে করা হচ্ছে।
ডুয়ার্সের সৌন্দর্যের বড় অংশ জুড়েই রয়েছে পাহাড়ি নদী। পর্যটকদের কাছে সেই নদীর টানও কম নয়। কিন্তু বর্ষার সময়ে সেই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে বড় বিপদ। তাই নদীর জল কম দেখালেও ঝুঁকি নেওয়া নয়—প্রশাসনের সতর্কবার্তা মেনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments