
নিউজ ডেস্ক; বিষধর সাপের ছোবলে গুরুতর অসুস্থ আলিপুরদুয়ারের লোকো পাইলট প্রদীপ ডুং ডুং-এর শারীরিক অবস্থার এখনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে তাঁর চেতনার স্তর আরও কমেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের আইসিইউতে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রেখে তাঁর চিকিৎসা চলছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হওয়ায় রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, আপাতত আগামী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষের প্রভাব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কতটা পড়েছে এবং ধীরে ধীরে সেই প্রভাব কমার পরে তাঁর শারীরিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি। হাসপাতালের সুপার পরিতোষ মণ্ডল জানিয়েছেন, অন্তত ৭২ ঘণ্টা না কাটলে রোগীর বিষয়ে নিশ্চিত ভাবে কোনও মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে বিষের প্রভাব কমতে শুরু করলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফের স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে শুরু করতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে কোমা থেকেও বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার রাতে। জানা গিয়েছে, ওই দিন রাতে ডিউটি শেষ করে আলিপুরদুয়ার জংশনের রেল আবাসনে ফিরেছিলেন প্রদীপ। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ তিনি বাথরুমে যান। সেখানেই আচমকা একটি বিষধর সাপ তাঁকে ছোবল দেয়। আচমকা এই ঘটনায় রেল আবাসনে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মীদের সহযোগিতায় দ্রুত তাঁকে চিকিৎসার জন্য রেলের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে রেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই প্রদীপ অচৈতন্য হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। চিকিৎসকদের সামনে তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, কী ভাবে দ্রুত বিষের প্রভাব মোকাবিলা করা যায় এবং একই সঙ্গে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
রেল আলিপুরদুয়ার ডিভিশনাল হাসপাতালে ভেন্টিলেটর না থাকায় সেখানে চিকিৎসকেরা অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের ঝুঁকি নেননি বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। অচৈতন্য অবস্থায় থাকা রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য উন্নত পরিকাঠামোর প্রয়োজন ছিল। সেই কারণেই তাঁকে দ্রুত আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
জেলা হাসপাতালে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা তাঁকে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেন। পাশাপাশি বিষধর সাপের ছোবলের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। চিকিৎসকদের লক্ষ্য ছিল এক দিকে শরীরে ছড়িয়ে পড়া বিষের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা, অন্য দিকে শ্বাসপ্রশ্বাস এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ কৃত্রিম সহায়তায় সচল রাখা।
তবে রেল হাসপাতাল থেকে জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪৫ মিনিট সময় কেটে যায়। এই সময়টিই চিকিৎসকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাসপাতাল সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই প্রদীপ অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে বিষের প্রভাব আরও বাড়ায় তাঁর চেতনার স্তর আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। বর্তমানে তাই তাঁকে আইসিইউতে রেখে লাগাতার নজরদারি করা হচ্ছে।
রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়িয়েছে। মেডিক্যাল বোর্ডের মাধ্যমে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কতটা স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছে, শ্বাসপ্রশ্বাসের অবস্থা কেমন, চিকিৎসায় শরীর কী ভাবে সাড়া দিচ্ছে—এই সমস্ত বিষয় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
সাপের বিষের ধরন এবং শরীরে তার প্রভাব অনুযায়ী রোগীর অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। বিষের প্রভাব স্নায়ুতন্ত্র বা শ্বাসপ্রশ্বাসের উপর পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে। প্রদীপের ক্ষেত্রে অচৈতন্য হয়ে পড়ার পর তাঁকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রাখতে হয়েছে। তাই চিকিৎসকেরা আপাতত কোনও তাড়াহুড়ো করে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইছেন না।
জেলা হাসপাতালের সুপার পরিতোষ মণ্ডল বলেন, ৭২ ঘণ্টা না কাটলে রোগীর বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, বিষের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে গেলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফের কাজ শুরু করতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে কোমা থেকেও রোগীর চেতনা ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। চিকিৎসকদের এই বক্তব্যেই আপাতত আশার আলো দেখছেন পরিবারের সদস্যরা।
প্রদীপ ডুং ডুং রেলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মী। ডিউটি শেষ করে নিজের আবাসনে ফেরার পর এমন দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় সহকর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আবাসনের বাথরুমের মতো জায়গায় বিষধর সাপের উপস্থিতি কী ভাবে ঘটল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বর্ষাকালে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন ঘটনা নতুন নয়। জল জমা, ঘন ঝোপঝাড় এবং বৃষ্টির কারণে সাপ অনেক সময় মানুষের বসতবাড়ি বা আবাসনের আশপাশে ঢুকে পড়ে।
তবে এখন সমস্ত নজর প্রদীপের চিকিৎসার দিকে। তাঁকে আইসিইউতে রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পাশাপাশি ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর শরীর চিকিৎসায় কী ভাবে সাড়া দেয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চিকিৎসকেরা আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। আগামী ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার আগে রোগীর সুস্থতার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় বলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে বিষের প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা উন্নত হলে তাঁর চেতনা ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে—এই আশাতেই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।
রবিবার রাতের সেই সাপের ছোবলের পর থেকেই লড়াই চলছে প্রদীপের। রেল আবাসন থেকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, পরে জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর, ভেন্টিলেশন এবং অ্যান্টিভেনম—সব মিলিয়ে চিকিৎসার একাধিক ধাপ ইতিমধ্যেই পেরিয়েছে। এখন আগামী কয়েক ঘণ্টাই বলে দেবে, তাঁর শরীর কতটা সাড়া দেয়। পরিবার, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীরা আপাতত তাকিয়ে রয়েছেন আইসিইউর দিকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments