Homeআলিপুরদুয়ারকুমারগ্রামচা বাগানের জলাশয়ে পড়ে বিপত্তি, দীর্ঘ চেষ্টায় উদ্ধার মা হাতি ও শাবক

চা বাগানের জলাশয়ে পড়ে বিপত্তি, দীর্ঘ চেষ্টায় উদ্ধার মা হাতি ও শাবক

নিউজ ডেস্ক; জঙ্গল থেকে লোকালয়ের দিকে আসার পথে বিপত্তি। আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম চা বাগানের সেচের জলাশয়ে পড়ে গেল মা হাতি ও
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 142113_edited (1)

নিউজ ডেস্ক; জঙ্গল থেকে লোকালয়ের দিকে আসার পথে বিপত্তি। আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম চা বাগানের সেচের জলাশয়ে পড়ে গেল মা হাতি ও তার শাবক। বুধবার সকালে ঘটনাটি নজরে আসতেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। খবর দেওয়া হয় বন দফতর ও পুলিশকে। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন বনকর্মী ও আধিকারিকেরা। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত জলাশয় থেকে নিরাপদে বার করে আনা হয় মা হাতি ও তার শাবককে। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, উদ্ধারের পর দু’টি হাতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। সব কিছু স্বাভাবিক থাকলে তাদের ফের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে বন দফতর।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সকালে কুমারগ্রাম চা বাগানের সেচের জলাশয়ে দু’টি হাতিকে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একটি পূর্ণবয়স্ক মা হাতি এবং তার সঙ্গে ছিল একটি শাবক। বিষয়টি নজরে আসার পরেই বাগান এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে। হাতি দেখতে আশপাশে ভিড় জমতে শুরু করে। তবে পরিস্থিতি যাতে আরও জটিল না হয়, সে কারণে বন দফতর ও পুলিশকে দ্রুত খবর দেওয়া হয়।

প্রাথমিক অনুমান, বক্সা জঙ্গল থেকে কোনও ভাবে লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসছিল মা হাতি ও তার শাবক। সেই সময় চা বাগানের ভিতরের ওই সেচের জলাশয়ে তারা পড়ে যায়। জলাশয়ের গঠন, পাড়ের পরিস্থিতি এবং হাতি দু’টির চলাচলের পথ খতিয়ে দেখার পরেই কী ভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বনকর্মীরা।

খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বন দফতরের দল। সঙ্গে যায় পুলিশও। শুরু হয় উদ্ধারকাজ। জলাশয়ের ভিতরে থাকা মা হাতি ও শাবককে নিরাপদে উপরে তুলে আনার জন্য একাধিক কৌশল নেওয়া হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে চেষ্টা। এক দিকে ছিল পূর্ণবয়স্ক হাতির শক্তি, অন্য দিকে শাবকটির নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা। ফলে খুব সাবধানে পুরো উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়।

বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, শেষ পর্যন্ত সফল হয় উদ্ধার অভিযান। জলাশয় থেকে বার করে আনা হয় মা হাতি এবং তার শাবককে। উদ্ধারের পর দু’টি হাতির শারীরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন বনকর্মীরা। তাদের শরীরে কোনও গুরুতর আঘাত রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে।

তবে এই ঘটনায় ফের সামনে এসেছে আলিপুরদুয়ারের চা বাগানগুলির সঙ্গে হাতির সংঘাতের বিষয়টি। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ চা-বলয় সংলগ্ন এলাকায় জঙ্গল থেকে হাতির দল প্রায়ই বেরিয়ে আসে। খাবার ও জলের সন্ধানে কখনও চা বাগান, কখনও বসতি এলাকার কাছাকাছি চলে আসে তারা। ফলে হাতি ও মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কখনও সেই পরিস্থিতি থেকে দুর্ঘটনাও ঘটে।

কুমারগ্রামের এই ঘটনাটি অবশ্য অন্য একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। মা হাতির সঙ্গে ছিল তার শাবক। ফলে উদ্ধারের সময় বন দফতরের সামনে অন্যতম বড় বিষয় ছিল শাবকটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মা হাতি সাধারণত শাবককে রক্ষা করতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। ফলে উদ্ধারকারী দলকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে বলেই জানা গিয়েছে।

ঘটনার পরে বন দফতরের তরফে হাতি দু’টির গতিবিধি ও তাদের আগের চলাচলের পথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বক্সা জঙ্গল থেকে কী ভাবে তারা চা বাগানের এলাকায় চলে এল, কোন পথ দিয়ে জলাশয়ের কাছে পৌঁছল এবং জলাশয়ে পড়ে যাওয়ার পিছনে ঠিক কী কারণ ছিল—এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি ওই এলাকায় এমন আরও কোনও জলাশয় রয়েছে কি না, সেগুলি হাতির চলাচলের ক্ষেত্রে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটিও নজরে আসতে পারে।

এরই মধ্যে আলিপুরদুয়ারে হাতির মৃত্যুর একটি ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র এক দিন আগেই, মঙ্গলবার, কালচিনি ব্লকের আতিয়াবাড়ি টি এস্টেট থেকে একটি হস্তিশাবকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। চা বাগানে কাজ করার সময় শ্রমিকেরা ওই শাবকটির দেহ দেখতে পান। পরে খবর যায় বন দফতরে। বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেহটি উদ্ধার করেন।

বন দফতরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক দিন আগে জঙ্গল থেকে একটি হাতির দল আতিয়াবাড়ি টি এস্টেট এলাকায় ঢুকেছিল। সেই দলেরই একটি শাবক কোনও ভাবে দলছুট হয়ে যায় বলে জানা গিয়েছে। পরে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। তবে ঠিক কী কারণে শাবকটির মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মৃত্যুর কারণ জানতে বন দফতর তদন্ত করছে।

একদিকে চা বাগানের জলাশয়ে পড়ে যাওয়া মা হাতি ও শাবককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার, অন্য দিকে কাছাকাছি সময়েই অন্য একটি চা বাগান থেকে হস্তিশাবকের মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনা—পর পর এই দুই ঘটনায় উত্তরবঙ্গের চা-বাগান ও হাতির চলাচল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বনকর্মীদের মতে, জঙ্গল সংলগ্ন চা বাগানগুলিতে হাতির আনাগোনা নতুন ঘটনা নয়। হাতির চলাচলের প্রাকৃতিক করিডর অনেক জায়গাতেই চা বাগান, রাস্তা বা জনবসতির কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে হাতির দল পথ পরিবর্তন করলে কিংবা খাবার ও জলের সন্ধানে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলে তারা এমন জায়গায় ঢুকে পড়তে পারে যেখানে আগে থেকেই নানা ধরনের বিপদ রয়েছে।

বিশেষ করে সেচের জলাশয় বা গভীর গর্তগুলি হাতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বড় হাতির পক্ষে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেখান থেকে উঠে আসা সম্ভব হলেও শাবকের ক্ষেত্রে বিপদ অনেক বেশি। কুমারগ্রামের ঘটনায় মা হাতি ও শাবককে একসঙ্গে উদ্ধার করা গেলেও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে চা বাগানগুলির ভিতরের জলাশয় ও হাতির চলাচলের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আরও নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

এই ঘটনার পরে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে এলাকায়। বন দফতরের নজরদারিতে রয়েছে উদ্ধার হওয়া মা হাতি ও তার শাবক। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাদের ফের বক্সার জঙ্গলের দিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। তবে জঙ্গল থেকে চা বাগান ও লোকালয়ে হাতির আনাগোনা এবং একের পর এক দুর্ঘটনার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় আরও সতর্কতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা জরুরি।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved