
নিউজ ডেস্ক : একদিকে ডিপো চত্বরে উড়তে থাকা ধুলো নিয়ন্ত্রণ, অন্য দিকে আচমকা আগুন লাগলে দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা—দুই সমস্যার সমাধান একসঙ্গে করতে অভিনব উদ্যোগ নিল পূর্ব রেল। আসানসোল ডিভিশনের অন্ডাল BOXN ডিপোয় তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ ব্যাটারি চালিত ই-রিকশা। ছোট আকারের এই বহুমুখী যানটির মধ্যে রাখা হয়েছে জল ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং জলভিত্তিক অগ্নিনির্বাপণ পরিকাঠামো। পূর্ব রেলের দাবি, পরিবেশগত স্বাস্থ্য এবং কর্মীদের নিরাপত্তা—দুই দিক মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেল সূত্রে খবর, অন্ডালের BOXN ডিপোর মতো ব্যস্ত এলাকায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত পৌঁছনোর জন্য বড় আকারের দমকল বা জলবাহী গাড়ির পরিবর্তে কমপ্যাক্ট কোনও যান থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে এই বিশেষ ই-রিকশা। ডিপোর অন্দরমহলে সহজে ঘোরাফেরা করতে পারে এমন ভাবেই যানটির নকশা করা হয়েছে। ফলে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেলে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক ভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যাবে।
আসানসোল ডিভিশনের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার সংগ্রহ মৌর্য জানিয়েছেন, ডিপোর ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং দ্রুত চলাচলের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই এই বহুমুখী যানটি তৈরি করা হয়েছে। ৮.৯৬ kWh ক্ষমতার লিথিয়াম রিচার্জেবল ব্যাটারিতে চলে ই-রিকশাটি। আকারে ছোট হওয়ায় এটি পরিচালনা করা সহজ এবং ডিপোর বিভিন্ন অংশে তুলনামূলক দ্রুত যাতায়াত করা সম্ভব। পাশাপাশি পরিচালন খরচও তুলনামূলক ভাবে কম বলে রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই ই-রিকশার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর জল ধারণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা। গাড়িটির সঙ্গে রয়েছে ৪৩০ লিটার ধারণক্ষমতার একটি জলের ট্যাঙ্ক। সেই জলের সাহায্যে একদিকে যেমন ডিপো চত্বরে ধুলো কমানোর কাজ করা যাবে, তেমনই জরুরি পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপণের প্রাথমিক কাজেও জল ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এর জন্য গাড়িতে ১.২ kW ক্ষমতার একটি পেট্রোলচালিত জল পাম্পও রাখা হয়েছে।
ধুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য গাড়িটিতে রয়েছে বিশেষ জল ছিটানোর দু’টি ব্যবস্থা। ডিপোর বিভিন্ন অংশে চলাচলের সময় এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জল ছড়িয়ে ধুলো বসিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে পণ্য ওঠানামা, রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্যান্য কাজের কারণে যে সব এলাকায় ধুলোর পরিমাণ বেশি থাকে, সেখানে এই ব্যবস্থা কর্মীদের জন্য অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার কর্মপরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।
অন্য দিকে, আগুনের মতো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ই-রিকশায় রাখা হয়েছে ১৫ মিটার দীর্ঘ একটি হোস পাইপ। পাইপটির ব্যাস ১ ইঞ্চি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত জল ছোড়া সম্ভব। অর্থাৎ বড় অগ্নিকাণ্ডের পরিবর্তে আগুনের প্রাথমিক বা কম থেকে মাঝারি তীব্রতার পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই যানটি বিশেষ ভাবে কার্যকর হতে পারে।
রেলের বক্তব্য, আগুন লাগার পরে প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছতে পারলে আগুনের বিস্তার অনেকটাই সীমিত রাখা সম্ভব। বড় দমকলের গাড়ি বা অন্যান্য অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর আগেই এই ছোট যানটি প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার সময় কমানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু অগ্নিনিরাপত্তাই নয়, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশের দিক থেকেও এই উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে পূর্ব রেল। দীর্ঘ সময় ধরে ধুলোময় পরিবেশে কাজ করতে হলে কর্মীদের জন্য অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। ডিপোর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত জল ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরিবেশ অনেকটাই পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হবে। একই যান দিয়ে সেই কাজ করার ফলে আলাদা করে ধুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্য কোনও যান বা ব্যবস্থার প্রয়োজনও কমতে পারে।
পূর্ব রেলের দাবি, এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য হল স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমপ্যাক্ট এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বড় পরিকাঠামোর পাশাপাশি ছোট আকারের দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল সরঞ্জামও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্ডাল ডিপোর এই ই-রিকশা সেই ভাবনারই একটি উদাহরণ।
পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি বলেন, অন্ডালের BOXN ডিপোয় তৈরি ব্যাটারি চালিত এই ই-রিকশা পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন এবং পরিচালনগত নিরাপত্তার প্রতি পূর্ব রেলের দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তাঁর কথায়, ছোট ও কমপ্যাক্ট নকশার মধ্যে ধুলো নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতাকে একত্র করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন কর্মীদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনই আকস্মিক কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
রেলের এই উদ্যোগে তাই একসঙ্গে উঠে আসছে পরিবেশ ও নিরাপত্তার দুই গুরুত্বপূর্ণ দিক। একটি ছোট ব্যাটারি চালিত যান কী ভাবে দৈনন্দিন ডিপো ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যেতে পারে, অন্ডালের এই উদ্ভাবন তারই নজির। আগামী দিনে পূর্ব রেলের অন্য ডিপো বা প্রাঙ্গণেও প্রয়োজন অনুযায়ী এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments