Homeরাজ্যএক মালিকের নামে একটিই টোটো! নির্দিষ্ট রুট ছাড়া চলবে না, যানজট কমাতে কড়া পথে রাজ্য

এক মালিকের নামে একটিই টোটো! নির্দিষ্ট রুট ছাড়া চলবে না, যানজট কমাতে কড়া পথে রাজ্য

নিউজ ডেস্ক; রাস্তায় বেআইনি টোটোর সংখ্যা বাড়তে থাকায় শহর ও শহরতলির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যানজট যেন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 120607_edited

নিউজ ডেস্ক; রাস্তায় বেআইনি টোটোর সংখ্যা বাড়তে থাকায় শহর ও শহরতলির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যানজট যেন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও একই মালিকের একাধিক টোটো, কোথাও আবার নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গিয়ে যাত্রী তোলা—এই ধরনের অভিযোগও কম নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার টোটোর মালিকানা এবং চলাচল, দু’দিকেই লাগাম পরানোর পরিকল্পনা করছে রাজ্য পরিবহণ দফতর। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, খুব শিগগিরই রাজ্যে চালু হতে পারে ‘এক মালিক, এক টোটো’ নীতি। সেই নিয়ম কার্যকর হলে একজন ব্যক্তির নামে একাধিক টোটো রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ থাকবে না।

শুধু মালিকানায় নিয়ন্ত্রণ নয়, টোটোর চলাচল নিয়েও তৈরি হতে চলেছে নির্দিষ্ট বিধি। বাস এবং অটোর মতো টোটোর জন্যও নির্দিষ্ট রুট ঠিক করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে পরিবহণ দফতর। অর্থাৎ নিজের ইচ্ছেমতো শহরের যে কোনও রাস্তা ধরে টোটো চালানোর সুযোগ থাকবে না। নির্ধারিত এলাকার বাইরে টোটো নিয়ে গেলে জরিমানার মুখে পড়তে পারেন চালক। প্রশাসনের যুক্তি, টোটোর সংখ্যা এবং অবাধ চলাচল—এই দুই সমস্যাকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যানজটের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও শহরতলিতে গত কয়েক বছরে টোটোর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গণপরিবহণের বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে টোটো জনপ্রিয় হলেও তার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। সরু রাস্তা থেকে ব্যস্ত বাজার এলাকা, স্টেশন চত্বর থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড়—প্রায় সর্বত্রই টোটোর ভিড় দেখা যায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক মালিকের হাতে একাধিক টোটো থাকার অভিযোগ। ফলে রাস্তায় মোট টোটোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেই মনে করছে প্রশাসন।

এই পরিস্থিতিতে ‘এক মালিক, এক টোটো’ নীতি নিয়ে এগোতে চাইছে পরিবহণ দফতর। প্রশাসনের একাংশের মতে, বর্তমানে কোনও কোনও এলাকায় একই ব্যক্তি একাধিক টোটো কিনে তা ভাড়ায় চালানোর ব্যবস্থা করেছেন। মালিক নিজে টোটো না চালিয়ে চালকদের দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। ফলে এক জনের হাতে একাধিক টোটো থাকায় রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা আরও বাড়ছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এই প্রবণতায় লাগাম পড়বে বলে মনে করছেন আধিকারিকেরা।

পরিবহণ দফতর সূত্রে খবর, নীতির অন্যতম লক্ষ্যই হল টোটোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। একজন ব্যক্তির নামে একটি মাত্র টোটো রেজিস্ট্রেশন করা গেলে একাধিক গাড়ির মালিকানা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিয়ম কমবে। একই সঙ্গে ভাড়ায় একাধিক টোটো চালানোর ব্যবসাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থায় পুরনো টোটোগুলির ক্ষেত্রে কী নিয়ম হবে, ইতিমধ্যে একাধিক টোটোর মালিকদের কী ভাবে নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে—এই বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।

টোটোর রুট নির্দিষ্ট করার পরিকল্পনাও প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বহু জায়গায় টোটো চালকেরা যাত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা অনুযায়ী নিজেরাই রুট ঠিক করেন। একটি পুরসভা এলাকা থেকে অন্য পুরসভা এলাকায় ঢুকে পড়া, স্টেশন বা বাজারের কাছে যাত্রী তোলার জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এবং ব্যস্ত রাস্তায় টোটোর জট—এই সব বিষয় নিয়েই অভিযোগ ওঠে।

পরিবহণ দফতরের এক আধিকারিকের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, ভবিষ্যতে রিষড়ার টোটো শ্রীরামপুর পুরসভা এলাকায় যেতে পারবে না। একই ভাবে শ্রীরামপুরের টোটোকেও রিষড়া পুরসভা এলাকায় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে না। অর্থাৎ টোটোকে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ধারিত এলাকার বাইরে টোটো নিয়ে গেলে পুলিশি নজরদারি ও জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে পারে।

প্রশাসনের যুক্তি, টোটোর জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তৈরি হলে একই রাস্তায় অতিরিক্ত টোটোর চাপ কমবে। যে এলাকায় যত সংখ্যক টোটো প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা করা সহজ হবে। পাশাপাশি রাস্তার গতি বাড়বে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজট কমানো সম্ভব হবে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও টোটো নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রশাসন।

রাজ্যের শ্রম ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের মন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্যও টোটো নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা এবং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য টোটোর উপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সেই কারণেই প্রশাসনিক স্তরে টোটো ব্যবস্থাকে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ‘এক টোটো, এক মালিকানা’ রেজিস্ট্রেশন চালু করা গেলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন তিনি।

তবে সরকারের পরিকল্পনাকে ঘিরে টোটো চালকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। চালকদের একাংশের অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে তৃণমূলের বেশ কিছু জনপ্রতিনিধি একাধিক টোটো কিনে রাস্তায় নামিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সেই টোটো ভাড়ায় চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এই অভিযোগের রাজনৈতিক সত্যতা নিয়ে পৃথক বিতর্ক রয়েছে, টোটো মালিকানার ক্ষেত্রে একাধিক গাড়ি একজনের হাতে থাকার প্রবণতা যে রয়েছে, তা নিয়ে প্রশাসনের নজর রয়েছে।

নতুন মালিকানা নীতি কার্যকর হলে এই ধরনের ব্যবসায়িক মালিকানার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একজন ব্যক্তির নামে একটি মাত্র টোটো থাকার নিয়ম হলে একাধিক টোটো কিনে ভাড়ায় খাটানোর সুযোগ অনেকটাই কমবে। তবে বাস্তবে সেই নিয়ম কী ভাবে প্রয়োগ করা হবে, পুরনো মালিকদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং চালকদের জীবিকার উপর তার প্রভাব কী হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

রুট নির্দিষ্ট করার বিষয়টিতে অবশ্য আপত্তি রয়েছে টোটো সংগঠনের একাংশের। বেঙ্গল ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শেখ নাসিরুদ্দিন জানিয়েছেন, ‘এক মালিক, এক টোটো’ নীতি চালু হলে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু টোটোর চলাচল নির্দিষ্ট রুটে আটকে দিলে সাধারণ যাত্রীদের সমস্যা হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।

নাসিরুদ্দিনের যুক্তি, টোটোর অন্যতম সুবিধাই হল এটি যাত্রীকে তুলনামূলক ভাবে কাছাকাছি গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। সাধারণ মানুষ সব সময় একই রুটে যাতায়াত করেন না। কেউ স্টেশন থেকে বাজারে যান, কেউ আবার একটি পুরসভা এলাকা থেকে পাশের এলাকায় যান। টোটো যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট রুটেই চলতে পারে, তা হলে যাত্রীদের একাধিক গাড়ি বদল করতে হতে পারে। এতে টোটোর মূল পরিষেবার সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই প্রশাসনের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হল—যানজট কমানোর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সহজ ও সস্তা যোগাযোগ ব্যবস্থাও কী ভাবে বজায় রাখা যায়। এক দিকে বেআইনি টোটোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, অন্য দিকে যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী রুট নির্ধারণ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।

প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে টোটো ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মালিকানায় ‘এক ব্যক্তি, এক টোটো’, আর চলাচলে নির্দিষ্ট এলাকা—এই দুই নিয়ম কার্যকর হলে শহর ও শহরতলির রাস্তায় টোটোর অবাধ দৌড় অনেকটাই কমতে পারে। তবে নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পর তার প্রয়োগ কতটা কঠোর হয় এবং যাত্রী ও চালকদের বাস্তব সমস্যাগুলি কী ভাবে সমাধান করা হয়, এখন সেই দিকেই নজর সকলের।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved