
নিউজ ডেস্ক; অনলাইন গেমের নেশায় বিপুল টাকা ধার হয়েছিল। সেই টাকা জোগাড় করতেই শেষ পর্যন্ত আত্মীয়ের কাছে গিয়েছিলেন দুই যুবক। অভিযোগ, টাকা দিতে অস্বীকার করায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কলকাতার ব্যবসায়ী অর্ণব সেনকে কুপিয়ে খুন করা হয়। মালদার ইংরেজবাজারে ব্যবসায়ী খুনের ঘটনায় তদন্তে নেমে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে খুনের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার পিছনে আর কেউ জড়িত কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের নাম শুভজিৎ ঘোষ এবং কৌশিক ঘোষ। শুভজিৎ মৃত ব্যবসায়ী অর্ণব সেনের আত্মীয়। অন্য দিকে, কৌশিক পেশায় রংমিস্ত্রি। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, অনলাইন গেমে আসক্তির কারণে দু’জনের আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। গেম খেলতে গিয়ে ধার করা টাকা পরিশোধের জন্যই অর্ণবের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে। সেই টাকা আদায় করতে গিয়েই খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার রাতে। ইংরেজবাজার শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গৌড় রোড সংলগ্ন ২ নম্বর গভর্নমেন্ট কলোনি এলাকায় নিজের বাড়িতেই খুন হন অর্ণব। তিনি কলকাতার ব্যবসায়ী ছিলেন। মালদায় তাঁর বাড়িতে এই ভাবে খুনের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ইংরেজবাজার থানার পুলিশ। শুরু হয় তদন্ত।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই অর্ণবের পরিচিত এবং আত্মীয়দের সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করেন তদন্তকারীরা। বাড়িতে কারা এসেছিলেন, কার সঙ্গে অর্ণবের সম্প্রতি আর্থিক লেনদেন হয়েছিল, কারও সঙ্গে কোনও বিবাদ চলছিল কি না—এমন একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই শুভজিৎ এবং কৌশিকের নাম সামনে আসে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
তদন্তকারীদের দাবি, অর্ণবের সঙ্গে শুভজিতের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। ফলে তাঁর বাড়িতে যাতায়াত বা যোগাযোগের বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। অন্য দিকে, কৌশিকের সঙ্গেও শুভজিতের যোগাযোগ ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন। দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি ধরা পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, অনলাইন গেমের পিছনে টাকা খরচ করতে গিয়ে দু’জনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল। সেই চাপ সামলাতেই অর্ণবের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কোনও কারণে সমস্যা তৈরি হয়। অভিযোগ, এরপরই উত্তেজিত হয়ে দু’জনে অর্ণবের উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। গুরুতর জখম অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে ঠিক কত টাকা নিয়ে ওই বিবাদ, অর্ণবের কাছ থেকে কত টাকা চাওয়া হয়েছিল এবং ঘটনার আগে বা পরে ধৃতদের মধ্যে কী ধরনের কথাবার্তা হয়েছিল—সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। পুলিশ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
জেলার পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন, শুভজিৎ ঘোষ মৃতের আত্মীয়। অনলাইন গেম খেলার সময় দুই যুবক অনেক টাকা ধার করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অর্ণব সেনের কাছে সেই টাকা চাওয়া হয়েছিল। টাকা আদায় করতে গিয়ে রাতের দিকে তাঁকে খুন করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হবে।
পুলিশের এই বক্তব্যের পর তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে অনলাইন গেমে আসক্তি এবং তার সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেন। গত কয়েক বছরে অনলাইন গেম ঘিরে টাকা হারানো, ঋণের চাপ এবং পারিবারিক অশান্তির একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। মালদার এই ঘটনাতেও সেই আর্থিক চাপই শেষ পর্যন্ত খুনের কারণ হয়ে উঠেছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার পিছনে শুধুই টাকা সংক্রান্ত বিবাদ ছিল, নাকি আগে থেকেই অর্ণবকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানতে চাইছে, দুই অভিযুক্ত কী ভাবে অর্ণবের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কোনও অস্ত্র আগে থেকেই ছিল কি না এবং খুনের পর তাঁরা কোথায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আশপাশের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অর্ণবের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন তদন্তকারীরা। মৃত ব্যবসায়ীর সঙ্গে ধৃতদের সাম্প্রতিক যোগাযোগ কেমন ছিল, কোনও টাকা-পয়সার লেনদেন হয়েছিল কি না, অর্ণব আগে কখনও তাঁদের কাছ থেকে টাকা চাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন কি না—এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র, আর্থিক লেনদেন এবং ঘটনার আগে-পরে তাঁদের গতিবিধি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে বলে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় তৃতীয় কোনও ব্যক্তি জড়িত কি না, সেই সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না তদন্তকারীরা।
এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। সেই প্রক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনাপ্রবাহ আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। অর্ণবকে কেন নিশানা করা হয়েছিল এবং টাকা সংক্রান্ত বিরোধ কী ভাবে প্রাণঘাতী হামলায় পরিণত হল, তার উত্তরও মিলতে পারে।
কলকাতার ব্যবসায়ী অর্ণব সেনের মালদার বাড়িতে খুনের ঘটনায় আপাতত দুই গ্রেপ্তারিকে কেন্দ্র করেই এগোচ্ছে তদন্ত। পুলিশের প্রাথমিক তত্ত্বে উঠে এসেছে অনলাইন গেম, ধার করা টাকা এবং সেই টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ। তবে অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াতেই চূড়ান্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আপাতত পুলিশের নজরে রয়েছে খুনের মোটিভ, অস্ত্রের হদিশ এবং ধৃতদের সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগের বিষয়টি
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments