
নিউজ ডেস্ক : পুজো আসার খবর কি ক্যালেন্ডারই প্রথম দেয়? নাকি তারও আগে শহরের বাতাসে, অলিগলিতে, মানুষের ব্যস্ততায়, মনের ভিতরে কোথাও যেন বাজতে শুরু করে আগমনী সুর? শরতের আকাশ তখনও পুরোপুরি নীল হয়ে ওঠেনি, ভোরের হাওয়ায় হালকা শিরশিরানি, কোথাও কাশফুল মাথা দোলাচ্ছে। আর কলকাতা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—আর বেশি দেরি নেই।
দুর্গাপুজো আসলে কয়েকটি দিনের উৎসব নয়। বাঙালির কাছে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় তার অনেক আগে থেকেই। পুজোর দিন গোনা, নতুন পোশাক কেনা, প্যান্ডেলের বাঁশ ওঠা, মৃৎশিল্পীর হাতে প্রতিমার অবয়ব তৈরি হওয়া—সব মিলিয়েই যেন উৎসবের প্রথম অধ্যায়। যে আনন্দ কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা, তা ছড়িয়ে পড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে।
ব্যস্ত জীবনের মধ্যে আনন্দ খোঁজার সময়টুকু যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। অফিস, যানজট, বাজার, কাজের চাপ, নিরন্তর ফোন—সব কিছুর মাঝখানে মানুষ নিজের জন্য একটু অবসর খোঁজে। সেই অবসরের নাম হয়ে ওঠে পুজো। তাই পুজোর ছুটি শুরু হওয়ার আগেই মন যেন ছুটে যায় সেই পরিচিত অথচ প্রতি বছর নতুন হয়ে ওঠা কলকাতার দিকে।
এই শহরকে বাইরে থেকে দেখলে ইট, কংক্রিট, ধোঁয়া, তারের জট আর যানবাহনের ভিড়। ফুটপাথে চায়ের কাপ, রাস্তার ধারে দোকান, বাসের হর্ন, অফিসফেরত মানুষের তাড়া—কলকাতার প্রতিদিনের ছবি এটাই। কিন্তু শরৎ এলেই সেই একই শহরের মধ্যে যেন আর একটি শহর জেগে ওঠে।
রাস্তার মোড়ে বাঁশের কাঠামো উঠতে শুরু করে। কোথাও মণ্ডপের কাজ, কোথাও আলো বসানোর প্রস্তুতি। কাপড়, কাঠ, থার্মোকল, রঙ, শিল্পীর হাত—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় এক-একটি কল্পনার জগৎ। দিনের পর দিন সেই নির্মাণ দেখতে দেখতে পথচলতি মানুষও তার অংশ হয়ে যান।
পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে কলকাতার রাস্তা তাই বদলে যায়। সন্ধ্যা নামলেই শহরের আলো যেন একটু বেশি উজ্জ্বল লাগে। যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন মানুষ অফিসে যান, সেই পথেই কয়েক দিনের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবের ভিড়। পাড়ার ছোট মণ্ডপ থেকে শুরু করে বড় থিমের পুজো—প্রতিটি জায়গাতেই মানুষের কৌতূহল।
তার পর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত রাতগুলো।
হাজার হাজার মানুষ তখন শহরের রাস্তায়। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার একাই বেরিয়ে পড়েছেন পুজো দেখতে। এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপ—হাঁটতে হাঁটতে কখন যে রাত গভীর হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। রাস্তার দু’পাশে খাবারের দোকান, আলো, মানুষের হাসি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব মিলিয়ে কলকাতা তখন যেন নিজের স্বাভাবিক ছন্দ ভুলে অন্য এক তালে হাঁটে।
তবে এই আনন্দের মধ্যেও রয়েছে পুজোর নিজস্ব ছোট ছোট কষ্ট। নতুন জুতো পরে বেরিয়ে কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর পায়ের অবস্থা যে কী হয়, তা পুজোপ্রেমী কলকাতাবাসীর চেয়ে ভালো আর কে জানে! কোথাও ব্যান্ডেজ, কোথাও জুতোর ফিতে নিয়ে বিরক্তি, কোথাও আবার দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি।
তবু কেউ বাড়ি ফিরতে চান না।
কারও হাতে ঠান্ডা পানীয়, কারও হাতে ফুচকার প্লেট। কারও ফোনের ব্যাটারি প্রায় শেষ, কিন্তু ছবি তোলা এখনও বাকি। কেউ আবার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের খুঁজছেন। সামনে এগোনোর চেষ্টা করতেই নিরাপত্তাকর্মীর বাঁশি, দড়ি টেনে তৈরি করা পথ, সাময়িক অপেক্ষা—পুজোর রাতের এই ছোটখাটো বিরক্তিগুলিও শেষ পর্যন্ত স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
মণ্ডপের বাইরে বিজ্ঞাপনের ঝলমলে পৃথিবী। চারদিকে বড় বড় হোর্ডিং। কোনও পরিচিত মুখ হাসিমুখে উৎসবের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কোথাও আবার পুজোর নতুন আয়োজনের প্রচার। শহর যেন নিজের বাণিজ্যিক মুখটিকেও উৎসবের সাজে সাজিয়ে নেয়।
কলকাতার পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এই মিশ্রণই। এখানে ঐতিহ্য যেমন আছে, তেমনই আছে আধুনিকতা। বনেদি বাড়ির পুরনো পুজো যেমন মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র, তেমনই নতুন প্রজন্মের তৈরি অভিনব থিমও সমান জনপ্রিয়। কোথাও ঢাকের শব্দ, কোথাও ডিজিটাল আলোকসজ্জা। কোথাও কয়েকশো বছরের পুরনো রীতি, কোথাও একেবারে নতুন ভাবনা।
আর এই দুই কলকাতা পাশাপাশি হাঁটে।
একটি কলকাতা স্মৃতির। অন্যটি নতুন সময়ের। পুজো এলেই দু’টি কলকাতার মধ্যে যেন সেতু তৈরি হয়। প্রবীণ মানুষ নাতি-নাতনিকে নিয়ে পুজো দেখতে বেরোন। তরুণেরা বাবা-মাকে নিয়ে মণ্ডপে যান। পুরনো বন্ধুত্ব ফের জেগে ওঠে। দূরে থাকা মানুষ ছুটে আসেন শহরে।
তাই পুজো শুধুমাত্র প্রতিমা দর্শন নয়। এটি ফিরে আসার উৎসবও।
সারা বছর যে মানুষটির সঙ্গে দেখা হয় না, পুজোয় তাঁর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। যে বন্ধুত্ব ব্যস্ততার কারণে দূরে সরে গিয়েছিল, তা আবার কোনও মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে আসে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন। কেউ নতুন জামা পরেন, কেউ পুরনো পুজোর স্মৃতি মনে করেন।
এই জন্যই পুজোর আনন্দের সঙ্গে এক ধরনের নরম বিষাদও মিশে থাকে।
দশমীর পর যখন মণ্ডপ খালি হতে শুরু করে, আলো নিভে আসে, ঢাকের শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যায়, তখন বোঝা যায়—উৎসবও একদিন শেষ হয়। যে রাস্তা কয়েক দিন আগেও মানুষের ঢলে ভেসেছে, সেখানে আবার স্বাভাবিক যান চলাচল শুরু হয়। দোকানের সামনে ভিড় কমে যায়। প্যান্ডেলের কাঠামো খুলতে শুরু করে।
শহর ফিরে যায় তার পুরনো চেহারায়।
কিন্তু মানুষের মনে থেকে যায় কয়েকটি রাত। নতুন জামার গন্ধ, ধূপের ধোঁয়া, ঢাকের আওয়াজ, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে আবার খুঁজে পাওয়া আপনজন, ক্লান্ত পায়ে আরও একটি মণ্ডপ দেখার জেদ—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় পুজোর স্মৃতি।
বিসর্জনের দিন তাই আনন্দের সঙ্গে মন খারাপও আসে। প্রতিমা যখন গঙ্গার জলে মিলিয়ে যায়, তখন মনে হয় উৎসবের সেই উজ্জ্বল সময়টুকুও যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। শহরের আলো নিভতে শুরু করে। মণ্ডপ ভাঙার শব্দ শোনা যায়। কয়েক দিন আগের কোলাহলের জায়গায় ফিরে আসে পরিচিত ব্যস্ততা।
তবু পরের বছরের অপেক্ষা শুরু হয়ে যায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
কারণ কলকাতার পুজো কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। একটি পুজোর বিসর্জনের মধ্যেই পরের পুজোর স্বপ্নের বীজ বোনা থাকে। কেউ ভাবেন আগামী বছর কোথায় যাবেন, কেউ নতুন জামার পরিকল্পনা করেন, কেউ আবার ঠিক করে ফেলেন কোন পুজোয় বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটাবেন।
এই শহর তাই প্রতি বছর নিজেকে নতুন করে সাজায়। শরৎ এলেই তার পুরনো রাস্তাগুলিতে নতুন আলো জ্বলে। ক্লান্ত মানুষ একটু অবসর পায়। স্মৃতি আর বর্তমান পাশাপাশি বসে।
আর তখনই মনে হয়—কলকাতার পুজো আসলে শুধু দেবীর আগমন নয়, শহরের নিজের কাছেই ফিরে আসারও উৎসব।
SEO-friendly WordPress Slug:kolkata-durga-puja-festival-autumn-city-transformation-emotion
Create a photorealistic Indian editorial feature photograph capturing Kolkata during the Durga Puja season in West Bengal, India. Show a beautifully illuminated Durga Puja pandal on a busy Kolkata street at evening, with thousands of diverse Bengali families, elderly people, young adults and children walking peacefully through the festive streets. Include traditional dhak musicians, warm decorative lights, temporary bamboo pandal structures, realistic old Kolkata architecture, food stalls and an atmosphere of anticipation and celebration. The composition should capture the emotional transformation of everyday Kolkata into a vibrant festive city, with a subtle sense of nostalgia and cultural heritage. Professional Indian newspaper feature photography, documentary photojournalism style, realistic human expressions, natural evening ambience, cinematic but authentic lighting, highly detailed photorealism. No political party symbols, no brand logos, no readable advertisements, no identifiable personal information, no watermark, no excessive artificial effects. 16:9 aspect ratio, 1920x1080 resolution.
:::
SEO ট্যাগ: Kolkata Durga Puja, Durga Puja 2026, Kolkata Puja, Sharodotsav, Puja Festival, Kolkata Culture, Durga Puja Pandal
পরের ধাপে চাইলে এটিকে আরও আবেগঘন “পুজোর ফিচার” স্টাইলে বা Google Discover-এর জন্য আরও আকর্ষণীয় শিরোনাম-সহ সাজানো যেতে পারে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments