
নিউজ ডেস্ক; দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মূর্তি ভাঙাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়াল দুর্গাপুরে। ডিএসপি টাউনশিপের হর্ষবর্ধন প্রাথমিক স্কুল সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা নেহরুর মূর্তিটি রবিবার সকালে স্কুলের অদূরের একটি জঙ্গলে পড়ে থাকতে দেখা যায়। কংগ্রেসের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে ক্রেন ব্যবহার করে মূর্তিটি তুলে নিয়ে গিয়ে ভেঙে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পিছনে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীদের হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। যদিও অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
রবিবার সকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ প্রথম মূর্তিটি জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখতে পান। খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছন কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তাঁদের দাবি, বহু বছর ধরে ওই এলাকায় নেহরুর মূর্তিটি ছিল। হঠাৎ করে সেটি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার ঘটনা নিছক কোনও দুর্ঘটনা হতে পারে না। পরিকল্পিত ভাবেই মূর্তিটি সরানো হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে হর্ষবর্ধন প্রাথমিক স্কুল চত্বরে প্রতিবাদ জানান কংগ্রেস কর্মীরা। পরে তাঁরা দুর্গাপুর থানায় যান। সেখানে বিক্ষোভ দেখানোর পাশাপাশি পুলিশের কাছে স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে। পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, সে দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
কংগ্রেসের অভিযোগের নিশানায় সরাসরি বিজেপি। দলের জেলা নেতৃত্বের দাবি, রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকেই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর মূর্তির সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে। কয়েক দশক ধরে ওই মূর্তি সেখানে ছিল। এত দিন কোনও সমস্যা হয়নি। আচমকা মূর্তিটি উধাও হয়ে গিয়ে পরে জঙ্গলে পড়ে থাকার ঘটনায় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন তাঁরা।
কংগ্রেসের জেলা সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী বলেন, ‘বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের কাজ। কয়েক দশক ধরে এই মূর্তি রয়েছে এখানে। পুলিশকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে আন্দোলন হবে।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, দ্রুত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে পারে কংগ্রেস।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় স্তরেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কী ভাবে একটি ভারী মূর্তি তার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল? সত্যিই কি ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছিল? মূর্তিটি আগে ভাঙা হয়েছিল, নাকি সরানোর সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? কারা সেটি সরাল এবং কী উদ্দেশ্যেই বা জঙ্গলে ফেলে রাখা হল—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ঘটনার তদন্তে স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ওই এলাকার আশপাশে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে কি না, থাকলে তাতে রাতের কোনও গতিবিধি ধরা পড়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মূর্তি সরানোর জন্য ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সেই সংক্রান্ত কোনও চিহ্ন ঘটনাস্থলে রয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
রাজনৈতিক ভাবে ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলেই মনে করছে দুর্গাপুরের রাজনৈতিক মহল। কারণ, নেহরুর মূর্তি ভাঙার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই কংগ্রেস-বিজেপির মধ্যে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। এক দিকে কংগ্রেস সরাসরি বিজেপির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে, অন্য দিকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দায়ী করা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে পুলিশের তদন্তের ফলাফলের উপরেই এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মূর্তির উপর আঘাত করা বা তা নষ্ট করা মেনে নেওয়া যায় না। তাঁদের মতে, দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে নেহরুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাঁর মূর্তি ভাঙার অভিযোগ কেবল একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, এর সঙ্গে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আবেগও জড়িয়ে রয়েছে।
অন্য দিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও চাইছেন দ্রুত ঘটনার রহস্যের সমাধান হোক। তাঁদের বক্তব্য, মূর্তিটি যদি পরিকল্পিত ভাবে সরানো হয়ে থাকে, তবে কারা এই কাজ করল তা সামনে আসা দরকার। আবার মূর্তিটি কোনও সরকারি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরানো হয়ে থাকলে তার নথিও প্রকাশ্যে আনা উচিত। কোনও ক্ষেত্রেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া ঠিক হবে না বলে মত তাঁদের।
রবিবারের ঘটনায় আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নেহরুর মূর্তি কী ভাবে স্কুল সংলগ্ন এলাকা থেকে জঙ্গলে পৌঁছল। কংগ্রেসের দাবি, এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। পুলিশ অবশ্য তদন্তের পরই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট করতে পারবে। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তবেই ঘটনার আসল চিত্র সামনে আসবে।
দুর্গাপুরে মূর্তি ভাঙার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের ২৪ ঘণ্টার সময়সীমার পর পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, তা নিয়েই এখন অপেক্ষা। তদন্তে যদি রাজনৈতিক যোগের প্রমাণ মেলে, তা হলে এই ঘটনা আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আর যদি অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক থাকে, সে ক্ষেত্রেও তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। আপাতত নেহরুর মূর্তি উদ্ধার এবং ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্তই স্থানীয়দের প্রধান দাবি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments