Homeপশ্চিম মেদিনীপুরঘাটালবীরসিংহের স্কুলে শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ, ‘ব্যবস্থা না নিলে আত্মহত্যা করব’ ছাত্রীর

বীরসিংহের স্কুলে শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ, ‘ব্যবস্থা না নিলে আত্মহত্যা করব’ ছাত্রীর

নিউজ ডেস্ক; শিক্ষক-শিক্ষিকাকে সাধারণত পড়ুয়াদের কাছে ভরসার জায়গা হিসেবেই দেখা হয়। স্কুলে কোনও সমস্যা হলে অভিভাবকের পাশাপাশি শিক্ষকের কাছেই সাহায্য
Screenshot 2026-08-30 145202_edited

নিউজ ডেস্ক; শিক্ষক-শিক্ষিকাকে সাধারণত পড়ুয়াদের কাছে ভরসার জায়গা হিসেবেই দেখা হয়। স্কুলে কোনও সমস্যা হলে অভিভাবকের পাশাপাশি শিক্ষকের কাছেই সাহায্য চায় পড়ুয়ারা। কিন্তু সেই শিক্ষিকার বিরুদ্ধেই যদি মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তা হলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে স্কুলের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে। এমনই গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমার বীরসিংহ গ্রামের একটি স্কুলে। অভিযোগ, ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষিকা ক্লাস চলাকালীন পড়ুয়াদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা করেন, নির্দিষ্ট গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা না করার জন্য চাপ দেন এবং বিজেপি-সমর্থিত কোনও গৃহশিক্ষকের কাছে টিউশন নিলে পরীক্ষায় নম্বর কেটে দেওয়ার হুমকি দেন।

এই অভিযোগ ঘিরেই ইতিমধ্যে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিভাবকদের স্বাক্ষর-সহ লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। বিষয়টি আরও গুরুতর আকার নিয়েছে এক ছাত্রীর একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। সেখানে ওই ছাত্রী অভিযোগ করেছে, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষিকার আচরণে সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। এমনকী, স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সে। যদিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োটির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি।

ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে বলে দাবি ছাত্রীর পরিবার এবং কয়েকজন অভিভাবকের। তাঁদের অভিযোগ, ইতিহাসের শিক্ষিকা নবনীতা ঘোষের আচরণ নিয়ে একাধিক বার আপত্তি জানানো হয়েছিল। ক্লাসরুমে পড়াশোনার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা থেকে শুরু করে পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষিকার হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।

অভিভাবকদের লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কোন ছাত্রী কোন গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট টিউশন নেয়, তা নিয়েও শিক্ষিকা খোঁজ নিতেন। অভিযোগ, বিজেপি-সমর্থিত কোনও গৃহশিক্ষকের কাছে পড়লে সংশ্লিষ্ট ছাত্রীর পরীক্ষার নম্বর কেটে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই ধরনের আচরণের ফলে পড়ুয়াদের মধ্যে ভয় ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছিল বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।

গত ১০ অগস্ট কয়েকজন অভিভাবকের স্বাক্ষর-সহ বিষয়টি লিখিত ভাবে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার কাছে জানানো হয়। অভিযোগ পাওয়ার পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাকে ডেকে সতর্কও করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শ্রাবণী দাস। শুধু তা-ই নয়, পরিস্থিতি মেটাতে অভিভাবক, ছাত্রী এবং অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বৈঠকে শিক্ষিকা উপস্থিত হননি।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্য, সোমবার স্কুলে ফের বৈঠক ডাকা হয়েছে। স্কুলের কোনও ছাত্রী যদি কোনও শিক্ষিকার আচরণের কারণে মানসিক ভাবে সমস্যায় পড়ে, তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাই অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিষয়টি শুধু স্কুলের অভ্যন্তরীণ অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এক ছাত্রীর বক্তব্যের ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ায় তা প্রকাশ্যে চলে আসে। ভিডিয়োয় ওই ছাত্রী দাবি করেছে, প্রায় আট মাস ধরে ইতিহাসের শিক্ষিকা তাঁকে মানসিক ভাবে হেনস্থা করছেন। শুধু তাঁর সঙ্গে নয়, স্কুলের আরও পড়ুয়াদের সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেছে সে।

ছাত্রীর অভিযোগ, বিষয়টি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি তার। এই পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে সে। অভিযোগের এই অংশ সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ছাত্রীর মা-ও স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রথম বার অভিভাবকেরা লিখিত অভিযোগ জানানোর সময়ই যদি বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হত, তা হলে তাঁর মেয়েকে এ ভাবে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে হত না। মেয়ের কোনও ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কে দায় নেবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। স্কুলে দ্রুত স্বাভাবিক এবং নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন ছাত্রীর মা।

তাঁর কথায়, মেয়েরা যেন নিশ্চিন্তে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারে এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে, সেটাই পরিবারের প্রধান চাওয়া। ক্লাসরুমে পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্কহীন আলোচনা বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্য দিকে, সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষিকা নবনীতা ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আর কয়েক মাস বাকি। এত বছর ধরে স্কুলে পড়ানোর সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আগে কখনও এমন অভিযোগ ওঠেনি। এখন যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা মিথ্যা বলেই দাবি তাঁর।

শিক্ষিকার দাবি, তিনি পড়ুয়াদের নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই এবং স্কুলে রাজনৈতিক আলোচনা করার অভিযোগও সত্যি নয় বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে তাঁর স্বামী সক্রিয় ভাবে তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন শিক্ষিকা। সেই কারণেই তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করা হয়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রশাসনের তরফেও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহকারী জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (ঘাটাল মহকুমা) হিমাদ্রিশেখর রায় জানিয়েছেন, সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়ো দেখার পরে তিনি ওই ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, অভিযোগের তদন্ত করতে সংশ্লিষ্ট স্কুল পরিদর্শককে স্কুলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার স্কুলে গিয়ে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। একজন ছাত্রী যে তাঁর শিক্ষিকার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলছে, বিষয়টিকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে শিক্ষা দপ্তর।

বীরসিংহ গ্রামটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মস্থান হিসেবে ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেই এলাকার একটি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিক ভাবেই বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও পক্ষকেই দোষী সাব্যস্ত করা যাচ্ছে না।

এখন মূল নজর প্রশাসনিক তদন্তের দিকে। অভিভাবকদের লিখিত অভিযোগ, ছাত্রীর বক্তব্য, স্কুল কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ এবং শিক্ষিকার বক্তব্য—সব দিক খতিয়ে দেখে শিক্ষা দপ্তর কী রিপোর্ট দেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ছাত্রীর মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।

স্কুলের ভিতরে রাজনৈতিক আলোচনা, পড়ুয়ার ব্যক্তিগত টিউশন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কিংবা নম্বর কমিয়ে দেওয়ার হুমকির মতো অভিযোগ সত্যি কি না, তদন্তেই তার উত্তর মিলবে। তবে অভিযোগটি যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। কারণ, একজন পড়ুয়ার কাছে স্কুল শুধু শিক্ষার জায়গা নয়—নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেই জায়গায় কোনও পড়ুয়া যদি নিজেকে মানসিক ভাবে অনিরাপদ মনে করে, তা হলে দ্রুত এবং নিরপেক্ষ ভাবে বিষয়টির সমাধান করা জরুরি।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved