নিউজ ডেস্ক;বয়স ৭১ বছর। সরকারি নথি অনুযায়ী তিনি পুরুষ। অথচ তাঁরই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গত পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত ঢুকছে বিধবা ভাতার টাকা! সম্প্রতি সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উপভোক্তাদের তালিকা যাচাই করতে গিয়ে এমনই অদ্ভুত তথ্য সামনে এসেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমার দাসপুর-২ ব্লকে। বিষয়টি জানাজানি হতেই প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা বাছাই এবং তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
ঘটনাটি দাসপুর-২ ব্লকের গোছাতি গ্রামের। সেখানকার বাসিন্দা ৭১ বছরের কেশব ঘোড়ইয়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই ঢুকছিল বিধবা ভাতার টাকা। এক-দু’মাস নয়, ২০২১ সাল থেকে টানা পাঁচ বছর ধরে এই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে বলে ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে কেশবের বক্তব্যও সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, তিনি বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করেননি। বরং বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদন করার পর তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকতে শুরু করে। কিন্তু সেটি যে বিধবা ভাতার টাকা, তা তিনি জানতেন না বলেই দাবি করেছেন।
কেশবের কথায়, ‘সেই সময় আমি বার্ধক্য ভাতার জন্যই আবেদন করেছিলাম। পরে টাকাও ঢুকতে শুরু করে। কিন্তু তা যে বিধবা ভাতার টাকা, জানতাম না।’ সম্প্রতি বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার সময়ে বিষয়টি জানার পরেই তিনি প্রশাসনকে তা জানিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বৃদ্ধ।
ইতিমধ্যেই ব্লক প্রশাসনের কাছে লিখিত ভাবে বিষয়টি জানিয়ে ওই ভাতা বন্ধ করার আবেদন করেছেন কেশব। তাঁর বক্তব্য, ভুলটি তাঁর তরফে হয়নি। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যের মাধ্যমে তিনি বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদন প্রক্রিয়ায় কোথাও ভুল হয়ে থাকলে তা সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
কেশবের বক্তব্য, ‘স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য মারফত আমি বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছিলাম। এতে আমার কোনও ভুল নেই। যাঁরা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের ভুলের কারণেই এমনটা হয়ে থাকতে পারে।’
ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২১ সাল থেকেই ওই বৃদ্ধের অ্যাকাউন্টে বিধবা ভাতার টাকা জমা পড়ছিল। সাম্প্রতিক যাচাই প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সামনে আসার পর কেশব নিজেই প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানান। তাঁর লিখিত আবেদন পাওয়ার পরে বিধবা ভাতা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসনের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা নতুন করে যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা-সহ বিভিন্ন প্রকল্পে প্রকৃত প্রাপকেরা সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তালিকায় কোনও অযোগ্য ব্যক্তি ঢুকে পড়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই যাচাইয়ের সময়েই দাসপুর-২ ব্লকে এই ঘটনা সামনে আসে।
একজন পুরুষের অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন ধরে বিধবা ভাতার টাকা পৌঁছে যাওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আবেদন থেকে শুরু করে উপভোক্তা তালিকায় নাম তোলা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো— প্রতিটি ধাপে তথ্য যাচাই কী ভাবে হয়েছিল?
বিশেষ করে পাঁচ বছর ধরে একই অ্যাকাউন্টে ওই ভাতা পৌঁছনোর পরেও কেন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে এল না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুধু আবেদনকারীর নাম বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর নয়, উপভোক্তার বয়স, লিঙ্গ এবং প্রকল্পের যোগ্যতার মতো মৌলিক তথ্যও যাচাই করার কথা। সেখানে এত দিন ধরে এই অসঙ্গতি কী ভাবে অদৃশ্য রইল, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
যদিও প্রশাসনিক ভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপির ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা সহ-সভাপতি প্রশান্ত বেরার অভিযোগ, এই ধরনের অনিয়ম বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্পের অর্থ বণ্টনে নানা ধরনের গরমিল হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে উপভোক্তা তালিকা যাচাই শুরু হওয়ায় একের পর এক অনিয়ম সামনে আসছে বলে দাবি তাঁর।
প্রশান্ত বেরার বক্তব্য, ‘এটা নতুন কিছু নয়। গত পনেরো বছরে তৃণমূল সরকার নানা ভাবে সরকারি প্রকল্পের টাকা নয়ছয় করেছে। আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সরকারি প্রকল্প ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। তাতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হোক বা বিধবা ভাতার মতো প্রকল্প, নানা অনিয়ম সামনে এসেছে।’
অন্য দিকে, বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে বাম শিবিরও। দাসপুরের সিপিএম নেতা তথা জেলা কমিটির সদস্য লক্ষ্মীকান্ত ভৌমিকের বক্তব্য, ৭১ বছরের একজন পুরুষের অ্যাকাউন্টে বিধবা ভাতার টাকা পৌঁছনোর ঘটনা যেমন বিস্ময়কর, তেমনই সরকারি প্রকল্পের প্রকৃত প্রাপকেরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর দাবি, এলাকায় এমন বহু মানুষ রয়েছেন যাঁরা বয়সের নির্দিষ্ট সীমা পেরিয়েও এখনও বার্ধক্য ভাতার সুবিধা পাচ্ছেন না। তাঁর বক্তব্য, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। ওই ব্যক্তির বয়স ৭১ বছর। একজন পুরুষ হয়েও তিনি বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। অথচ যাঁদের বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গিয়েছে, তাঁরা এখনও বার্ধক্য ভাতা পাননি।’
লক্ষ্মীকান্তের অভিযোগ, সরকারি প্রকল্পের অর্থ বণ্টনে আগের সরকারের সময় যেমন অনিয়ম ছিল, বর্তমান সরকারও রাজনৈতিক স্বার্থে প্রকল্পের সুবিধা বণ্টন করছে। তাঁর দাবি, যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেক প্রাপকের কাছে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছনো নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক যাচাইয়ের প্রশ্ন। সরকারি প্রকল্পে কোনও ভুল তথ্য ঢুকে পড়লে তার প্রভাব শুধু সরকারের আর্থিক ব্যবস্থার উপরই পড়ে না, প্রকৃত উপভোক্তারাও বঞ্চিত হতে পারেন। কারণ একটি প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে। অযোগ্য ব্যক্তির কাছে সেই অর্থ গেলে যোগ্য ব্যক্তির জন্য বরাদ্দ বা সুবিধা নিয়ে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দাসপুর-২ ব্লকের এই ঘটনা সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। কেশব ঘোড়ইয়ের দাবি অনুযায়ী, তিনি বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অ্যাকাউন্টে পৌঁছতে শুরু করে বিধবা ভাতার টাকা। যদি আবেদনপত্রের তথ্য এবং সরকারি নথির মধ্যে কোথাও ভুল হয়ে থাকে, তবে সেটি কোন স্তরে হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কেশবের অ্যাকাউন্টে এত দিন ধরে টাকা জমা পড়লেও তিনি কেন বিষয়টি বুঝতে পারেননি, সেটিও একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। গ্রামাঞ্চলের অনেক প্রবীণ মানুষের ক্ষেত্রেই ব্যাঙ্কে টাকা জমার উৎস বা সরকারি প্রকল্পের নাম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা না থাকার সম্ভাবনা থাকে। ফলে প্রশাসনের তরফে উপভোক্তাদের নিয়মিত ভাবে তাঁদের প্রাপ্য প্রকল্প এবং টাকা সম্পর্কে অবহিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
এখন কেশব নিজেই বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে বিধবা ভাতা বন্ধ করার আবেদন করেছেন। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের কোনও প্রক্রিয়া হবে কি না, অথবা বার্ধক্য ভাতার জন্য তাঁর আবেদনটি নতুন করে বিবেচনা করা হবে কি না, তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
সব মিলিয়ে, দাসপুরের এই ঘটনা সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব ফের সামনে এনে দিয়েছে। এক দিকে যেমন অযোগ্য উপভোক্তাদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজন, তেমনই প্রকৃত যোগ্য মানুষের কাছে যাতে সময়মতো সরকারি সহায়তা পৌঁছয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার মাধ্যমে এমন আরও কোনও অসঙ্গতি সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর। কারণ কেশব ঘোড়ইয়ের ঘটনা হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ভুল, আবার বৃহত্তর কোনও প্রশাসনিক গাফিলতির ইঙ্গিতও হতে পারে। তদন্ত এবং পূর্ণাঙ্গ যাচাই শেষ হলেই তার প্রকৃত ছবি স্পষ্ট হবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments