
নিউজ ডেস্ক; ডেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্পকে ঘিরে জমি, পাট্টা এবং চাকরির অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে সামনে এল বীরভূমে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে। শনিবার রামপুরহাটের ঐতিহ্যবাহী ‘রক্তকরবী’ মঞ্চে আয়োজিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রকল্প সংক্রান্ত এক দুর্নীতির প্রসঙ্গ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি সূত্রের খবর, বৈঠকে তিনি অভিযোগ করেন, বর্ধমানের এক তৃণমূল নেতা আদিবাসীদের জমি কিনে তা প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়ে প্রকল্পে চাকরি নিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে আলোচনার সময়ই প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়।
তবে বৈঠকে বিষয়টি সামনে আসার পরই জেলা প্রশাসনের তরফে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। বীরভূমের জেলাশাসক জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাট্টা বাতিল করা হয়েছে। এরপর মুখ্যমন্ত্রী জানতে চান, সেই পাট্টার ভিত্তিতে যে চাকরি হয়েছিল, তার কী অবস্থা? জেলাশাসকের উত্তর, চাকরিটিও বাতিল করা হয়েছে।
প্রশাসনিক বৈঠকের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ডেউচা-পাচামি প্রকল্প নিয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজ্য সরকারের তরফে একটি ‘কংক্রিট রোডম্যাপ’ প্রকাশ করা হবে। একই সময়ে তিনি ফের বীরভূমে আসবেন এবং প্রকল্প এলাকার আদিবাসীদের মধ্যে খাস জমির পাট্টা বিতরণ করবেন বলেও জানান।
ডেউচা-পাচামি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও এ দিন প্রশাসনিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা কার্যকর, সরকারি জমি ব্যবহার করে এলাকায় শিল্পায়ন কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট জমির ব্যবহার কী ভাবে নির্ধারণ করা হবে—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শনিবারের প্রশাসনিক বৈঠকে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের পাশাপাশি বীরভূম জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ডেউচা-পাচামি প্রসঙ্গ ওঠার পরই জমি ও চাকরি সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
ডেউচা-পাচামি প্রকল্পকে ঘিরে জমি অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সময়ে দাবি করা হয়েছিল, এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খোলামুখ কয়লাখনি প্রকল্প হতে চলেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়েছিল। পাশাপাশি জমিদাতাদের চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়। খননকাজ শুরু করার প্রস্তুতিও হয়েছিল। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রকল্পের কাজ কার্যত থমকে যায়।
রাজ্যে বিজেপি প্রধান বিরোধী দল থাকার সময়ে এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, প্রকল্প এলাকায় যাঁদের আদৌ জমি ছিল না, তাঁদের একাংশও ভুয়ো পাট্টা বা জমির নথি দেখিয়ে চাকরি পেয়েছেন। জমি ও চাকরির এই পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ডেউচা-পাচামি প্রকল্প নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। বীরভূম জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খননকাজ বন্ধ হওয়ার আগে মোট ১,৯১৩ জন জমিদাতাকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি ঘিরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়। ফলে প্রকল্পটির সঙ্গে শুধু স্থানীয় মানুষের জমি ও জীবিকার প্রশ্নই নয়, রাজ্যের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিকল্পনাও জড়িয়ে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শনিবারের বৈঠকে জমি সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে প্রকল্প এলাকার আদিবাসীদের জমি বিক্রি এবং পাট্টা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনকে সাবধানী হতে বলা হয়েছে। কোনও জমির মালিকানা বা পাট্টা নিয়ে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন না ওঠে, তা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই গোটা প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনার দায়িত্ব বীরভূমের অতিরিক্ত জেলাশাসকের উপর দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, বীরভূমের আদিবাসীদের জমির পাট্টা বর্ধমানের কিছু তৃণমূল নেতাকে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই পাট্টাগুলি বাতিল করা হয়েছে। ওই পাট্টার ভিত্তিতে যে চাকরিগুলি হয়েছিল, সেগুলিও বাতিল করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, দুর্নীতির অভিযোগে কোনও রকম ছাড় দেওয়া হবে না।
ডেউচা-পাচামির পাশাপাশি বীরভূমে পাথর ও বালি ব্যবসাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গও এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে উঠে আসে। পাথর ও বালি কারবারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার প্রসঙ্গে নাম না করে মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীদের অভিযোগের জবাব দেন। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন দলের সাংসদ এবং বিধায়ক আগে এই ধরনের মামলাকে ‘মিথ্যা মামলা’ বলে দাবি করতেন। কিন্তু কেউ যদি সত্যিই চুরি বা বেআইনি কাজ করে থাকেন, তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই প্রসঙ্গে রাজ্যে রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিপুল পরিমাণ অর্থ আগে অন্য পথে চলে যেত। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র তিন মাসে ২৫৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যেখানে আগের পুরো বছরে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৮২ কোটি টাকা। তবে এই দাবির বিস্তারিত সরকারি নথি এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
ডেউচা-পাচামি নিয়ে আগামী মাসে আরও বড় ঘোষণা আসতে পারে বলেই এ দিনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা বা ‘কংক্রিট রোডম্যাপ’ প্রকাশ করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি আদিবাসীদের জমির অধিকার এবং সরকারি জমির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশাসনিক পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, আদিবাসীদের অধিকার, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়ন—প্রতিটি বিষয়ই সংবেদনশীল। অতীতে জমি ও চাকরি সংক্রান্ত অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে কোনও বিতর্ক তৈরি না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তাই মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটির সিদ্ধান্তও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন নজর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকে। ডেউচা-পাচামি প্রকল্পকে ঘিরে রাজ্য সরকার কী পরিকল্পনা নেয়, সরকারি জমিতে শিল্পায়নের কী মডেল তৈরি হয় এবং আদিবাসীদের জমির পাট্টা ও চাকরি সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের পর আর কী পদক্ষেপ করা হয়—সেদিকেই তাকিয়ে বীরভূমের মানুষ। প্রকল্পটি ফের গতি পাবে, নাকি নতুন কোনও কাঠামোয় এগোবে, তার উত্তর মিলতে পারে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত সেই ‘কংক্রিট রোডম্যাপে
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments