
নিউজ ডেস্ক; প্রেসিডেন্সি জেলের হাই সিকিউরিটি জোনে বন্দি কুখ্যাত জঙ্গি আফতাব আনসারির সেল থেকে মোবাইল ফোন, রাউটার, সিমকার্ড-সহ একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। শুধু ইলেকট্রনিক সামগ্রীই নয়, তাঁর সেল থেকে নগদ ৩১ হাজার টাকা উদ্ধার হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। শুক্রবার রাতে তল্লাশি চালিয়ে এই সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এরপরই জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বন্দির কাছে এতগুলি নিষিদ্ধ সামগ্রী কী ভাবে পৌঁছল, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। আফতাব আনসারির বিরুদ্ধে ওই রাতেই হেস্টিংস থানায় এফআইআর দায়ের করেছেন কারা কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলি কী কাজে ব্যবহার করা হত, সেগুলির মাধ্যমে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না এবং দীর্ঘদিন ধরে ওই সামগ্রী তাঁর কাছে ছিল কি না— সব দিক খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
আমেরিকান সেন্টারে হামলার মূল চক্রী হিসেবে পরিচিত আফতাব আনসারি বর্তমানে প্রেসিডেন্সি জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ২০০২ সালে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে জঙ্গি হামলার ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসে। ওই মামলায় ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল কলকাতার সেশনস কোর্ট তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে।
২০১০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সেশনস কোর্টের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিষয়টি পৌঁছয় সুপ্রিম কোর্টে। ২০১৪ সালে দেশের শীর্ষ আদালত আফতাবের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। সেই সময় থেকেই তিনি প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি রয়েছেন।
কারা সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক দিন আগে গোপন সূত্রে খবর আসে, জেলের ১৪ নম্বর সেলে থাকা আফতাব আনসারি কোনও ভাবে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করছেন। সেই তথ্য পাওয়ার পরই কারা কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের তরফে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু হয়। পরে শুক্রবার রাতে নির্দিষ্ট সেলে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়।
তল্লাশিতে যা উদ্ধার হয়েছে, তার তালিকাই তদন্তকারীদের চমকে দিয়েছে। সূত্রের দাবি, আফতাবের সেল থেকে দু’টি জিও রাউটার উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি পাওয়া গিয়েছে তিনটি জিও সিমকার্ড। এছাড়াও তিনটি ওটিজি পেনড্রাইভ, ১২৮ জিবির একটি সাধারণ পেনড্রাইভ এবং একটি হেডফোন উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি আইফোন। একই সঙ্গে নগদ ৩১ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
একজন হাই সিকিউরিটি বন্দির সেলে এতগুলি ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা কী ভাবে এল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত জেলের ভিতরে বন্দিদের কাছে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য যোগাযোগের ডিভাইস রাখা নিষিদ্ধ। সেখানে নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেও একটি আইফোন, রাউটার এবং একাধিক সিমকার্ড কী ভাবে পৌঁছল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তকারীদের সামনে আরও একটি বড় প্রশ্ন— ওই ডিভাইসগুলি ব্যবহার করে আফতাব কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন? রাউটার এবং একাধিক সিমকার্ড ব্যবহারের উদ্দেশ্য কী ছিল? উদ্ধার হওয়া ফোন বা অন্যান্য স্টোরেজ ডিভাইস থেকে কোনও তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কোনও সূত্র রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
তদন্তকারীদের একাংশের সন্দেহ, জেলের ভিতর থেকে বাইরের কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। সেই যোগাযোগ ব্যক্তিগত, অপরাধমূলক নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্যে— তা এখনও স্পষ্ট নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখা হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি।
এর পাশাপাশি তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে জেলের অন্দরমহল। কারণ হাই সিকিউরিটি জোনে থাকা একজন বন্দির কাছে এতগুলি ডিভাইস এবং নগদ টাকা পৌঁছতে গেলে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পেরোতে হয়েছে। ফলে কারও সাহায্য বা গাফিলতি ছিল কি না, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিক ভাবে উঠছে।
কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জেলের ভিতরে নিয়মিত তল্লাশি এবং বন্দিদের গতিবিধির উপর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে এত দিন ধরে এই সামগ্রী নজরের বাইরে রইল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। উদ্ধার হওয়া রাউটারগুলি সক্রিয় ছিল কি না, সিমকার্ডগুলি কখন ব্যবহার করা হয়েছে, আইফোনে কী ধরনের তথ্য রয়েছে— ফরেন্সিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেসব তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
এখানেই সামনে আসছে জেল নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রশ্ন। অতীতেও জেলের ভিতর থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপরাধচক্র পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। বন্দিরা জেলের ভিতর বসে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে তা শুধু কারা আইনের লঙ্ঘন নয়, জননিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুতর আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
রাজ্য সরকারের তরফেও অতীতে জেলের ভিতরে বেআইনি মোবাইল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। জেল থেকে অপরাধচক্র পরিচালনার অভিযোগ সামনে আসার পর কারা ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানোর কথাও জানিয়েছিল সরকার। সেই প্রেক্ষাপটে আফতাবের সেল থেকে নতুন করে মোবাইল এবং যোগাযোগের একাধিক ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনা প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট অস্বস্তিকর বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
তদন্তকারীরা এখন মূলত তিনটি বিষয় জানতে চাইছেন। প্রথমত, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলি কত দিন ধরে আফতাবের কাছে ছিল। দ্বিতীয়ত, সেগুলি ব্যবহার করে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তৃতীয়ত, জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সামগ্রীগুলি তাঁর সেলে পৌঁছে দিয়েছিল কে বা কারা।
নগদ ৩১ হাজার টাকা উদ্ধারের বিষয়টিও আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই টাকা কোথা থেকে এল, তার কোনও বৈধ উৎস রয়েছে কি না এবং জেলের ভিতরে তা কোনও লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত হত কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
সব মিলিয়ে, প্রেসিডেন্সি জেলের মতো উচ্চ নিরাপত্তার জেলে আফতাব আনসারির সেল থেকে আইফোন, রাউটার, সিমকার্ড, পেনড্রাইভ, হেডফোন এবং নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্তে প্রকৃত তথ্য সামনে এলে তবেই বোঝা যাবে, এগুলি নিছক বেআইনি ভাবে রাখা সামগ্রী ছিল, নাকি এর পিছনে আরও বড় কোনও যোগাযোগ বা পরিকল্পনার যোগ রয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments