Homeহাওড়াহাওড়া-হুগলিতে খাবারের দোকানে হানা, কোথাও মরা ইঁদুর, কোথাও বাসি খাবার!

হাওড়া-হুগলিতে খাবারের দোকানে হানা, কোথাও মরা ইঁদুর, কোথাও বাসি খাবার!

নিউজ ডেস্ক; খাবারের দোকানে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে তো? খাবার ঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না? নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি
resizeplus_Screenshot 2026-08-29 130935_edited (1)

নিউজ ডেস্ক; খাবারের দোকানে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে তো? খাবার ঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না? নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে কি? দোকানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স রয়েছে তো? এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হাওড়া ও হুগলির বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাল পুরসভার স্বাস্থ্য দপ্তর এবং পুলিশ। ফুটপাথের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে মুদিখানা, ফাস্টফুড, মিষ্টি ও ফলের দোকান— বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে খাবারের গুণমান, পরিচ্ছন্নতা এবং পণ্যের দাম খতিয়ে দেখেন আধিকারিকেরা। অভিযানে কোথাও খাবার খোলা অবস্থায় রাখার অভিযোগ সামনে এসেছে, কোথাও আবার মিষ্টির দোকানে মরা ইঁদুর দেখতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আধিকারিকেরা। একটি ফাস্টফুডের দোকানে বেশ কয়েক দিনের পুরোনো খাবার পড়ে থাকতে দেখেও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাওড়ার ডুমুরজলার রিং রোড সংলগ্ন এলাকায় ফুটপাথের একাধিক খাবারের দোকানে অভিযান চালানো হয়। পুরনিগমের স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকেরা মূলত খাবারের দোকানগুলিতে পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি কতটা মেনে চলা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখেন। প্রতিদিন ফুটপাথের এই সব দোকান থেকে বহু মানুষ খাবার খান। ফলে খাবার তৈরির জায়গা থেকে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েই জোর দেওয়া হয়।

পুরনিগম সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডেপুটি কমিশনার-১ সুপ্রভাত চট্টোপাধ্যায় এবং সচিব অনুপম চক্রবর্তী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য দপ্তরের ওএসডি আশুতোষ কুণ্ডু-সহ অন্যান্য আধিকারিক। দোকানগুলিতে গিয়ে বিভিন্ন খাবার সরেজমিনে পরীক্ষা করেন তাঁরা।

খাবারগুলি ঠিক ভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে কি না, খোলা অবস্থায় কোনও খাবার রাখা হচ্ছে কি না, খাবার তৈরির জায়গা কতটা পরিষ্কার— সবই দেখা হয়। পাশাপাশি খাবার পরিবেশনের স্থান এবং দোকানের সামগ্রিক পরিবেশও খতিয়ে দেখেন পুরকর্মীরা। খাবারের সংস্পর্শে আসা জায়গাগুলিতে নোংরা বা অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি রয়েছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া হয়।

অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ফুড লাইসেন্স। সংশ্লিষ্ট দোকানদারদের কাছে লাইসেন্স রয়েছে কি না, সেই সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকেরা। পুরসভার পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে খাবারের দোকানের ক্ষেত্রে ফুড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হবে। ফলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে লাইসেন্স সংগ্রহ করার জন্য তাঁদের সতর্ক করা হয়েছে।

পুরসভার বক্তব্য, রাস্তার ধারে এবং ফুটপাথে থাকা খাবারের দোকানগুলির ক্রেতা মূলত সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে খাবার খান। তাই খাবার প্রস্তুত এবং পরিবেশনের জায়গায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবার যাতে খোলা অবস্থায় না থাকে, খাবার তৈরির জায়গা যাতে পরিষ্কার রাখা হয় এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স যাতে থাকে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হচ্ছে।

শুধু হাওড়াতেই নয়, শুক্রবার হুগলির রিষড়াতেও বাজারদর এবং খাদ্যের গুণমান খতিয়ে দেখতে যৌথ অভিযান চালানো হয়। রিষড়া পুরসভা এবং স্থানীয় পুলিশ যৌথ ভাবে পশ্চিমপাড়ার বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালায়। মুদিখানা, ফাস্টফুড, মিষ্টি, ফল— বিভিন্ন ধরনের দোকান ছিল নজরদারির আওতায়।

অভিযানে ছিলেন রিষড়া পুরসভার প্রশাসক মধুমিতা ঘোষ, এগজ়িকিউটিভ অফিসার জয়ন্ত দত্ত, নোডাল অফিসার অসিতাভ গঙ্গোপাধ্যায়, আরআই রূপক কুণ্ডু এবং রিষড়া থানার পুলিশকর্মীরা। দোকানে গিয়ে শুধু খাবারের মানই নয়, পণ্যের বিক্রয়মূল্যও পরীক্ষা করেন তাঁরা।

দোকানদারেরা যে দামে পণ্য কিনেছেন, তার প্রমাণ হিসেবে কেনার বিলও দেখতে চাওয়া হয়। সেই তুলনায় ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করেন আধিকারিকেরা। বাজারে অযথা বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ যাতে না ওঠে, সে জন্যই এই নজরদারি বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে।

এর পাশাপাশি দোকানে থাকা পণ্য এবং খাবারের গুণমানও পরীক্ষা করা হয়। এই সময়েই একটি মিষ্টির দোকানে মরা ইঁদুর দেখতে পান আধিকারিকেরা। বিষয়টি নজরে আসতেই তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খাদ্যসামগ্রী বিক্রির জায়গায় এমন পরিস্থিতি কী ভাবে তৈরি হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। একটি মুদিখানায় রাখা কয়েকটি পণ্যের গুণমান নিয়েও আধিকারিকেরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয় একটি ফাস্টফুডের দোকানে। সেখানে বেশ কয়েক দিনের পুরোনো খাবার পড়ে থাকতে দেখেন অভিযানে থাকা আধিকারিকেরা। খাবার কত দিনের পুরোনো এবং কেন তা বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দোকানের মালিক অবশ্য সেই সময় উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন আধিকারিকেরা এবং তাঁকে দেখা করতে বলা হয়।

খাবারের গুণমান নিয়ে ফের অভিযোগ সামনে এলে সংশ্লিষ্ট দোকান বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ শুধু সতর্ক করেই অভিযান শেষ করার পথে হাঁটছে না প্রশাসন। খাদ্যের মান নিয়ে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ ফের উঠলে আরও কড়া পদক্ষেপ করা হতে পারে।

পুরসভা এবং পুলিশের এই যৌথ অভিযানের ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সতর্কতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্য সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের বক্তব্য, বাজারে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে খাদ্যের গুণমান সরাসরি যুক্ত। তাই নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

রিষড়া পুরসভার আধিকারিকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুক্রবারের অভিযান কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একদিন অভিযান চালিয়ে নজরদারি বন্ধ করে দেওয়া হবে না। প্রতি সপ্তাহে রিষড়ার বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযান চালানো হবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্যের গুণমান, দোকানের পরিচ্ছন্নতা এবং পণ্যের দাম— তিনটি বিষয়েই নিয়মিত নজরদারি চলবে।

হাওড়ার ডুমুরজলা থেকে হুগলির রিষড়া— পর পর দু’দিনের অভিযানে প্রশাসনের সামনে যে ছবিটা এসেছে, তাতে রাস্তার খাবার এবং বাজারজাত খাদ্যসামগ্রীর স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে ফুটপাথের দোকানগুলিতে খাবার ঢেকে রাখা এবং পরিষ্কার পরিবেশ বজায় রাখার নির্দেশ, অন্যদিকে রিষড়ায় মরা ইঁদুর ও পুরোনো খাবার উদ্ধারের মতো ঘটনা— সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে।

তবে আধিকারিকদের বক্তব্য, এই অভিযান শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। ক্রেতাদের নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। ব্যবসায়ীদেরও নিয়ম মেনে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সতর্ক করার পরেও যদি একই ধরনের অনিয়ম ফের সামনে আসে, সে ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে।

ফলে আগামী দিনে হাওড়া ও হুগলির বিভিন্ন বাজার এবং খাবারের দোকানে পুরসভা ও পুলিশের নজরদারি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে খাবারের দোকানগুলিতে পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষণ, লাইসেন্স এবং বিক্রয়মূল্য— এই চারটি বিষয়েই প্রশাসনের কড়া নজর থাকবে। সাধারণ মানুষের পাতে খাবার পৌঁছনোর আগে সেই খাবার কতটা নিরাপদ, এবার থেকে তার উপরেই বাড়তি গুরুত্ব দিতে চাইছে স্থানীয় প্রশাসন।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved