Homeকলকাতা‘বেরোতে পারবেন না’! শুভেন্দুর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ মমতা

‘বেরোতে পারবেন না’! শুভেন্দুর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ মমতা

নিউজ ডেস্ক: অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর এবার পৌঁছে গেল ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং ‘হুমকি’-র অভিযোগে। এক দিকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী
resizeplus_Ai Image (1)

নিউজ ডেস্ক: অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর এবার পৌঁছে গেল ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং ‘হুমকি’-র অভিযোগে। এক দিকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনায় যোগ্য মহিলাদের বেছে বেছে টাকা দেওয়া হচ্ছে। অন্য দিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, তাঁর সরকার কোনও ধর্ম, দল বা সম্প্রদায় দেখে প্রকল্পের সুবিধা দিচ্ছে না। এই রাজনৈতিক তরজার মধ্যেই মমতাকে উদ্দেশ করে শুভেন্দুর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে রাজ্য রাজনীতি।

সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু মমতার ফেসবুক লাইভ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ফেসবুকেই থাকুন… আপনাকে রাস্তায় আর বেরোতে হবে না। রাস্তায় আপনি যাতে না বেরোতে পারেন, তার ব্যবস্থাও আমি করব।’’ এই মন্তব্য সামনে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট করে পাল্টা আক্রমণ করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, একজন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীকে তাঁর চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।

মমতার প্রশ্ন, এমন মন্তব্য কি একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, একজন মুখ্যমন্ত্রী সংবিধান রক্ষার শপথ নেন। সেই পদে থাকা কোনও ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক বিরোধীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের কথা প্রকাশ্যে বলেন, তা হলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রশ্নও তৈরি করে।

মমতার দাবি, শুভেন্দুর বক্তব্যের অর্থ কী—গৃহবন্দি করে রাখা, ভয় দেখানো, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? তাঁর কথায়, একটি গণতান্ত্রিক দেশে কে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কোনও রাজনৈতিক নেতার হাতে থাকতে পারে না।

তবে এই সংঘাতের সূত্রপাত মূলত অন্নপূর্ণা যোজনা ঘিরে। মমতার আমলে মহিলাদের আর্থিক সহায়তার জন্য চালু হয়েছিল লক্ষ্মীর ভান্ডার। বর্তমান সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনাকেও একই ধরনের সামাজিক সহায়তা প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ ও বিক্ষোভের খবর সামনে এসেছে।

মমতার অভিযোগ, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বহু মহিলা প্রতিশ্রুত অর্থ পাচ্ছেন না। কোথাও সরকারি দফতরে গিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠছে, কোথাও আবার প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাছবিচারের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী প্রচারের সময় যে ভাবে প্রকল্পের সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল নেই।

সোমবার ফেসবুক লাইভে অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে সরব হয়ে মমতা অভিযোগ করেন, সুবিধাভোগীদের ‘বেছে’ টাকা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, বাছবিচার তাঁর সরকার করছে না, বরং এই ধরনের কাজ আগের সরকার করত বলে তাঁর অভিযোগ।

এর পরেই ধর্মীয় পরিচয় এবং তোষণের রাজনীতি নিয়ে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। শুভেন্দুর দাবি, তাঁর সরকার কোনও সুবিধাভোগী হিন্দু না মুসলমান, বিজেপি না তৃণমূল—তা দেখে প্রকল্পের টাকা দিচ্ছে না। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি অন্নপূর্ণা যোজনায় অর্থপ্রাপ্তির একটি হিসাবও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এখনও পর্যন্ত ১ কোটি ৪৫ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪৭২ জনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রকল্পের টাকা পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে ১৯ লক্ষ ২০ হাজার মুসলিম সুবিধাভোগী রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

শুভেন্দুর অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বহু মানুষ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। মতুয়া, নমশূদ্র, রাজবংশী, আদিবাসী এবং পাহাড়ি এলাকার মহিলাদেরও বঞ্চনার অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি বদলেছে।

অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য একটি পোর্টাল খোলা হয়েছিল বলেও দাবি করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, সেখানে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগকারীদের বড় অংশের বক্তব্য, প্রকল্পের যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও পরিচিত কিছু মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন। এই অভিযোগগুলির বিস্তারিত তথ্য আগামী ৩১ অগস্ট প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।

অন্য দিকে, মমতা জানিয়েছেন, অন্নপূর্ণা যোজনায় যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়াবেন তিনি। বঞ্চিত মহিলাদের নাম, ঠিকানা, পেশা এবং যোগ্যতার তথ্য সংগ্রহ করে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ করার কথাও বলেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

এই প্রসঙ্গে রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও মমতাকে আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, কোনও প্রকল্প চালু করার আগে তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান থাকা জরুরি। পূর্ববর্তী সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিপুল ঋণের বোঝা, কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা এবং পেনশন সংক্রান্ত বকেয়া-সহ একাধিক বিষয় বর্তমান সরকারকে সামলাতে হয়েছে।

শুভেন্দুর বক্তব্যে অবশ্য অন্নপূর্ণা যোজনার বিতর্কের পাশাপাশি মমতার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও কটাক্ষ ছিল। বারুইপুরের একটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড এবং হালিশহরের একটি মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি মমতার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তাঁকে বেশি কথা না বলে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শও দেন।

এই মন্তব্যই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করে। রাতে নিজের সমাজমাধ্যমের পোস্টে শুভেন্দুর বক্তব্যের অংশ তুলে ধরে মমতা বলেন, তিনি কোনও স্বৈরাচারী শক্তির সামনে মাথা নত করার মানুষ নন। তাঁর অভিযোগ, শুভেন্দুর মন্তব্য কোনও বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কটাক্ষ নয়; এর মধ্যে বিরোধীদের ভয় দেখানোর একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতা রয়েছে।

মমতার বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কারও সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার কথা বলা হলে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, বিরোধীদের ভয় দেখানো, ভিন্নমতকে শাস্তি দেওয়া এবং নাগরিক অধিকারকে শাসকের অনুগ্রহ হিসেবে দেখার রাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

সব মিলিয়ে অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্পের টাকা পাওয়া বা না-পাওয়ার প্রশ্নে আটকে নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক তোষণ, সরকারি অর্থনীতি, বিরোধীদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়ে বিস্তর রাজনৈতিক সংঘাত। শুভেন্দুর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে মমতার ‘হুমকি’-র অভিযোগ সেই সংঘাতকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাজ্য রাজনীতিতে এখন তাই নজর অন্নপূর্ণা যোজনার অভিযোগগুলির নিষ্পত্তি এবং দুই শিবিরের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকে। পাশাপাশি শুভেন্দুর মন্তব্য নিয়ে মমতার তোলা সাংবিধানিক প্রশ্নও আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved