
নিউজ ডেস্ক : এ যেন সত্যিই চোখের সামনে ম্যাজিক! বাজার থেকে প্রায় ৩৭০০ টাকা দামের দেড় কেজি ইলিশ মাছ কিনলেন এক মহিলা। তারপর জানালেন, সঙ্গে টাকা নেই। কাছেই তাঁদের কাপড়ের দোকান রয়েছে, সেখান থেকে মাছের দাম মিটিয়ে দেবেন। মাছ বিক্রেতার বিশ্বাস অর্জন করে হাতে তুলে নিলেন প্যাকেটবন্দি ইলিশ। এমনকি দোকান পর্যন্ত পৌঁছনোর জন্য রিকশার ব্যবস্থাও হল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছনোর পরেই ঘটল অদ্ভুত ঘটনা। মাত্র ২০০ মিটারের মধ্যে কার্যত ‘উধাও’ হয়ে গেলেন ওই মহিলা! সঙ্গে নিয়ে গেলেন প্রায় ৩৭০০ টাকা দামের ইলিশও।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ি সংলগ্ন বাজার এলাকায়। মাছ ব্যবসায়ীর অভিযোগ, শুধু মাছ নিয়েই ওই মহিলা চলে যাননি, দাম মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে আরও ৩০০ টাকা ধারও নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার টাকারও বেশি। ঘটনার পর মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই ব্যবসায়ী। এমনকি দুঃখে নিজের দোকানও বন্ধ করে দিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
প্রতিদিনের মতোই মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ি সংলগ্ন বাজারে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন ব্যবসায়ী প্রসেনজিৎ বিশ্বাস। ইলিশের মরসুমে বাজারে চাহিদা যথেষ্ট বেশি। তার উপর সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় ইলিশের দামও বেশ চড়া। সেই সময় ষাটোর্ধ্ব এক মহিলা তাঁর দোকানে এসে মাছ দেখতে চান।
ব্যবসায়ীর কাছে থাকা বড় ইলিশগুলির মধ্যে প্রায় দেড় কেজি ওজনের একটি মাছ তাঁর পছন্দ হয়। মাছটির দাম ব্যবসায়ী জানিয়েছিলেন ৩৭৮৮ টাকা। কিন্তু ক্রেতা মহিলা জানান, ৮৮ টাকা বাদ দিয়ে তিনি ৩৭০০ টাকা দেবেন। শেষ পর্যন্ত সেই দামেই মাছটি বিক্রি করতে রাজি হয়ে যান প্রসেনজিৎ।
এর পর নিয়ম মেনে মাছটি কেটে পরিষ্কার করে প্যাকেট করে দেওয়া হয়। প্যাকেট হাতে নেওয়ার পরেই বদলে যায় পরিস্থিতি।
মহিলা তখন ব্যবসায়ীকে জানান, বাজারের উল্টো দিকে কাঠগোলা এলাকায় তাঁদের একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। সেখানে গিয়েই তিনি ইলিশের দাম দিয়ে দেবেন। শুধু তা-ই নয়, বয়সের কারণে একা যেতে অসুবিধা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাই একটি রিকশা ডেকে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
বয়স্ক মহিলা হওয়ায় তাঁর কথায় প্রথমে সন্দেহ হয়নি মাছ বিক্রেতার। বরং বিশ্বাস করেই তাঁকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসায়ী। নিজের পরিচিত বাবাই নামে এক ব্যক্তিকে ওই মহিলার সঙ্গে পাঠিয়ে দেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল, মহিলা যাতে নিরাপদে কথিত কাপড়ের দোকানে পৌঁছে টাকা দিয়ে দিতে পারেন।
এর পর স্থানীয় এক পরিচিত রিকশাচালককে ডেকে আনা হয়। রিকশায় করে মহিলা ও বাবাই বাজার থেকে কাঠগোলা এলাকার দিকে রওনা দেন। দূরত্বও খুব বেশি নয়—মোটামুটি ২০০ মিটারের মতো।
কাঠগোলা এলাকায় পৌঁছে মহিলা মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। এর পর তিনি স্থানীয় একটি কাপড়ের দোকানের নাম উল্লেখ করে জানান, সেখান থেকেই ইলিশের দাম মিটিয়ে দেওয়া হবে।
মহিলার কথায় বিশ্বাস রেখে বাবাইও তাঁকে নিয়ে ওই দোকানের দিকে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছে বিপাকে পড়েন তিনি। কারণ, দোকানে গিয়ে জানতে পারেন, ওই মহিলার সঙ্গে দোকানের কোনও যোগাযোগ নেই। এমনকি মাছের টাকা দেওয়ার জন্য ওই মহিলাকে কেউ পাঠিয়েছেন—এমন কোনও ঘটনাও দোকানদারের জানা নেই।
ততক্ষণে অবশ্য অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে।
যে জায়গায় মহিলাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি। সঙ্গে ছিল সেই প্যাকেটবন্দি দেড় কেজির ইলিশ। অর্থাৎ, মাছ হাতে নিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে মাত্র কয়েকশো মিটারের মধ্যে কার্যত হদিসহীন হয়ে যান তিনি।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। মাছ ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ইলিশের দাম ৩৭০০ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ওই মহিলা তাঁর কাছ থেকে আরও ৩০০ টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই টাকা পরে ফেরত দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি।
ফলে মাছের দাম এবং ধার—দুই মিলিয়ে ব্যবসায়ীর মোট আর্থিক ক্ষতি চার হাজার টাকারও বেশি। এত বড় অঙ্কের টাকা ও মাছ হারানোর ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই হতবাক হয়ে যান প্রসেনজিৎ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার পর থেকেই মনমরা হয়ে পড়েন ওই মাছ ব্যবসায়ী। পরিস্থিতির কারণে সেদিন নিজের দোকানও বন্ধ করে দেন তিনি। বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও ঘটনাটি শুনে কার্যত অবাক।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বাজারজুড়ে এখন একটাই আলোচনা—মাত্র ২০০ মিটারের মধ্যে কী ভাবে ওই মহিলা উধাও হয়ে গেলেন?
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ মজা করে ঘটনাটিকে ‘পিসি সরকারের ম্যাজিক’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে হাসি-ঠাট্টার আড়ালে রয়েছে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগও। কারণ, অচেনা ক্রেতার কথায় বিশ্বাস করে পণ্য তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা তাঁদের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, তাঁদের এলাকায় এ ধরনের ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে বাজারে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পর ওই মহিলার পরিচয় জানার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন, আগে থেকেই মাছ ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করেছিলেন কি না, নাকি আচমকাই এমন পরিকল্পনা করেছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত ছিলেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ, মহিলা কী ভাবে এত অল্প দূরত্বের মধ্যে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সরে গেলেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাজার এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
স্থানীয় বাজার কমিটির তরফেও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে। অচেনা ক্রেতার কথায় বিশ্বাস করে টাকা না নিয়ে দামি পণ্য তুলে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘কাছেই দোকান’, ‘এখন টাকা নেই, পরে দিয়ে দেব’—এই ধরনের কথায় যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে বিশ্বাস না করেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
মধ্যমগ্রামের এই ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন, ৩৭০০ টাকার ইলিশ নিয়ে ২০০ মিটারের মধ্যে কোথায় গেলেন সেই মহিলা? উত্তর খুঁজতে বাজারের সিসিটিভি ফুটেজই এখন অন্যতম ভরসা। পাশাপাশি, কথিত কাপড়ের দোকানটির সঙ্গে ওই মহিলার আদৌ কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত এগোলেই হয়তো সামনে আসবে, এটি নিছক প্রতারণার ঘটনা, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কোনও পরিকল্পনা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments