Homeউত্তর ২৪ পরগনাবারাসতহস্টেলে হামলার পর আবাসিকদেরই ঘরছাড়া, গ্রেপ্তার নিয়ে তুমুল বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে

হস্টেলে হামলার পর আবাসিকদেরই ঘরছাড়া, গ্রেপ্তার নিয়ে তুমুল বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে

Screenshot 2026-08-27 173952

নিউজ ডেস্ক; ক্যাম্পাসে বয়েজ় হস্টেলের আবাসিক পড়ুয়াদের উপর বহিরাগতদের হামলার অভিযোগ। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই হস্টেল খালি করার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই আবাসিকদের এ ভাবে হস্টেল ছাড়তে হওয়ায় পঠনপাঠন এবং নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশি গ্রেপ্তার নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। অভিযোগ, হস্টেলে হামলায় চার জন আবাসিক পড়ুয়া আহত হলেও তাঁদের পক্ষেরই চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতেই রেজিস্ট্রার সুবীর বিশ্বাসের তরফে হস্টেল খালি করার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সেখানে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধে পৌনে ৬টায় বয়েজ় হস্টেলে ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সন্ধে ৬টার মধ্যে হস্টেল ফাঁকা করতে হবে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উপাচার্য দেবব্রত মিত্রের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, হস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। সেই কারণেই আপাতত কয়েক দিনের জন্য হস্টেল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপযুক্ত সময়ে হস্টেল ফের চালু করা হবে। উপাচার্যের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে পড়ল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ঘটনার তদন্তের জন্য বিশিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়েজ় হস্টেলে বর্তমানে ৩১ জন আবাসিক ছাত্রের জন্য ৪১ জন নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এত সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও বহিরাগতরা কী ভাবে হস্টেলে ঢুকে ভাঙচুর চালাল, তা নিয়ে পড়ুয়া, শিক্ষক ও গবেষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় দু’পক্ষের মধ্যে মারপিটের পাশাপাশি ব্লেড ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে। ঘটনায় চার জন আবাসিক ছাত্র আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

হস্টেল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের মধ্যে। অধ্যাপক ও আধিকারিকদের অনেকের বক্তব্য, শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই হঠাৎ হস্টেল ফাঁকা করে দিলে সমস্যায় পড়বেন আবাসিকরা। বিশেষত দূরের জেলা থেকে আসা পড়ুয়াদের নিয়মিত বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করা কঠিন। ফলে হস্টেল বন্ধের সিদ্ধান্ত সরাসরি তাঁদের পড়াশোনার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইতিমধ্যেই কয়েক জন পড়ুয়া হস্টেল ছেড়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র শরিফ বফাদার জানিয়েছেন, তিনি হস্টেল ছেড়ে বাড়ি যাচ্ছেন। কবে আবার হস্টেল খুলবে, তা জানা নেই। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। মঙ্গলবারের ঘটনার কথা জানতে পেরে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন তিনি।

গোটা ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাখিবন্ধন উৎসবকে ঘিরে ছাত্র সংগঠনগুলির রেষারেষির যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানের আয়োজনের নিয়ন্ত্রণ ছিল তৃণমূল ছাত্র পরিষদের হাতে। এ বার রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর অনুষ্ঠানটির দখল নিয়ে টিএমসিপি এবং এবিভিপির মধ্যে কয়েক দিন ধরে টানাপড়েন চলছিল বলে পড়ুয়াদের একাংশের দাবি।

শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখিবন্ধন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। তার আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুই ছাত্র সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে। এরপর বয়েজ় হস্টেলে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হস্টেল বন্ধের সিদ্ধান্ত সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের অভিযোগ, বহিরাগত এবিভিপি সমর্থকদের হাতে টিএমসিপি সমর্থক কয়েক জন আবাসিক ছাত্র আক্রান্ত হন। অথচ পুলিশ টিএমসিপির চার কর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতদের নাম অনিরুল ইসলাম, আবু সামা, শাকিল মহতপুরে এবং রহমতুল্লা শেখ। বুধবার তাঁদের বারাসত আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক জামিনে মুক্তি দেন।

এ দিন বারাসত আদালতে উপস্থিত ছিলেন টিএমসিপির রাজ্য সভানেত্রী প্রিয়াঙ্কা অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, যাঁরা মারধর করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ টিএমসিপির আক্রান্ত চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও বারাসত পুলিশ জেলার এসপি জে মারসি জানিয়েছেন, পুলিশের কাছে যে অভিযোগ এসেছে, তার ভিত্তিতেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

উপাচার্য দেবব্রত মিত্র অবশ্য জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে কোনও অভিযোগ করেনি। পুলিশ নিজেদের মতো করে ঘটনার তদন্ত করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, পুলিশ এবং ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্যে কার্যত তৈরি হয়েছে তিনমুখী চাপানউতোর।

অন্যদিকে, এবিভিপিও পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনের বারাসত নগর সম্পাদক প্রীতম পাঠকের দাবি, বয়েজ় হস্টেলে ঢোকার সময় টিএমসিপির কর্মীরা তাঁদের উপর হামলা চালান। তাঁর অভিযোগ, হামলায় ব্লেড ব্যবহার করা হয়েছিল। দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।

ঘটনার পর টিএমসিপির চার কর্মী-সমর্থককে বারাসত থানায় রাখা হয়েছিল। তাঁদের গ্রেপ্তারের কারণ জানতে মঙ্গলবার রাতেই রেজিস্ট্রার সুবীর বিশ্বাস কয়েক জন অধ্যাপকের সঙ্গে থানায় যান। বুধবারও রেজিস্ট্রার ও কয়েক জন শিক্ষক প্রথমে দত্তপুকুর থানায় এবং পরে বারাসত আদালতে উপস্থিত হন।

এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিতে সরব হন এবিভিপি সমর্থকেরা। বুধবার তাঁরা জগন্নাথপুর মোড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত মিছিল করেন। মিছিল থেকে রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিও তোলা হয়।

সব মিলিয়ে রাখিবন্ধন উৎসবের আগে পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত। একদিকে বয়েজ় হস্টেল বন্ধ করে আবাসিকদের বাড়ি পাঠানোর সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে সংঘর্ষে গ্রেপ্তার নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলির পরস্পরবিরোধী অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হল ক্যাম্পাসে দ্রুত শান্তি ফেরানো, বহিরাগতদের প্রবেশ রোখা এবং সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করা।

আপাতত হস্টেল কবে খুলবে, সেই উত্তর নেই। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে আবাসিক পড়ুয়াদের। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব যেন তাঁদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘস্থায়ী না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved