Last updated: September 3rd, 2026 at 09:51 pm

নিউজ ডেস্ক; বীরভূমের রেল মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সিউড়ি থেকে প্রান্তিক পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা ফের বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে খবর। একই সঙ্গে সিউড়ির সঙ্গে রেলপথে সরাসরি যুক্ত হতে পারে বক্রেশ্বরও। নতুন রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হলে শুধু বীরভূমের প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাই বদলাবে না, সিউড়ি হয়ে বর্ধমান ও কলকাতার সঙ্গে যাতায়াতও অনেক সহজ হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বুধবার পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার গীতিকা পাণ্ডের সঙ্গে বৈঠকের পরে এই সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী তথা সিউড়ির বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। পূর্ব রেলের সদর দফতরে আয়োজিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বীরভূমের জেলাশাসক ধবল জৈনও। বৈঠকের পর মন্ত্রী জানান, সিউড়ি থেকে প্রান্তিক এবং সিউড়ি থেকে নলা হয়ে বক্রেশ্বর পর্যন্ত রেল যোগাযোগের বিষয়ে পূর্ব রেল ইতিবাচক পদক্ষেপ করছে।
প্রস্তাবিত এই দুই রেলপথকে প্রধানমন্ত্রী গতিশক্তি প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জগন্নাথ। তাঁর দাবি, প্রকল্প দু’টির জন্য আনুমানিক ২,৫০০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। রেললাইন নির্মাণের আগে যে সমস্ত প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন, সেগুলির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও ঠিক করা হয়েছে। সেই সময়সীমা মেনে কাজ এগোলে আগামী দিনে সিউড়ি জংশন স্টেশনে পরিণত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সিউড়ি থেকে প্রান্তিক পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের দাবি নতুন নয়। বহু বছর ধরেই এই রুটের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু নানা কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। এক সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এই রেলপথের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এবার ফের প্রকল্পটি নিয়ে নড়াচড়া শুরু হওয়ায় তাঁদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
জগন্নাথ জানিয়েছেন, সিউড়ি থেকে প্রান্তিক রেলপথের জন্য ইতিমধ্যেই ড্রোনের মাধ্যমে সমীক্ষা করা হয়েছে। কোন কোন এলাকার উপর দিয়ে রেললাইন যাবে, সেই সংক্রান্ত একটি ভিডিয়োও তিনি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সমীক্ষার ছবি সামনে আসার পর প্রস্তাবিত রুট নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। তাঁদের মতে, রেললাইন তৈরি হলে সিউড়ি থেকে প্রান্তিক, রাজনগর এবং আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল বদলে যেতে পারে।
প্রান্তিক ও বক্রেশ্বর—দুই এলাকাই বীরভূমের পর্যটন ও ধর্মীয় মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক শান্তিনিকেতন ও বোলপুরের কাছাকাছি হওয়ায় পর্যটকদের কাছে পরিচিত। অন্য দিকে, বক্রেশ্বর শৈব তীর্থক্ষেত্র এবং সতীপীঠ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্র। বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণ, মন্দির এবং ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে প্রতি বছর বহু মানুষ সেখানে যান। সরাসরি রেল যোগাযোগ তৈরি হলে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, বর্তমানে সিউড়ি থেকে বর্ধমান বা কলকাতা যেতে অনেক সময় সড়কপথের উপর নির্ভর করতে হয়। নতুন রেলপথ চালু হলে কম সময়ে এবং তুলনামূলক কম খরচে বড় শহরগুলিতে পৌঁছনো সম্ভব হবে। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে বাইরে যাতায়াত করা মানুষজন উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও স্থানীয় সামগ্রী দ্রুত অন্য বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বক্রেশ্বর রেলপথে যুক্ত হলে ওই এলাকার পর্যটন পরিকাঠামোও আরও উন্নত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল, ছোট ব্যবসা, পরিবহণ, খাবারের দোকান এবং স্থানীয় হস্তশিল্পের বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। রাজনগর ব্লকের একাধিক এলাকা নতুন রেল মানচিত্রে যুক্ত হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতি পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রকল্প নিয়ে উদ্যোগ বাড়ানোর কথা জানিয়েছিলেন জগন্নাথ। তিনি রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। সেই সময় সিউড়ি থেকে প্রান্তিক এবং আরও কয়েকটি রুটে ট্রেন চালুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গিয়েছে। এবার পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রকল্পের বিষয়ে আরও নির্দিষ্ট আশ্বাস মিলেছে বলে দাবি মন্ত্রীর।
তবে রেললাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে জমি, পরিবেশ, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং অর্থ বরাদ্দের মতো একাধিক বিষয় জড়িত থাকে। ফলে ঘোষণার পর বাস্তব নির্মাণকাজ শুরু হতে এখনও কিছুটা সময় লাগতে পারে। প্রস্তাবিত রুটের সমীক্ষা, বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট, জমি সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এবং টেন্ডারের কাজ শেষ হওয়ার পরই নির্মাণের গতি স্পষ্ট হবে।
তবু বহু বছরের অপেক্ষার পরে সিউড়ি-প্রান্তিক ও সিউড়ি-বক্রেশ্বর রেলপথের সম্ভাবনা সামনে আসায় বীরভূমের মানুষ আশাবাদী। তাঁদের প্রত্যাশা, এবার আর পরিকল্পনা কাগজে আটকে থাকবে না। দ্রুত কাজ শুরু হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেললাইন তৈরি হলে সিউড়ি শুধু জেলা সদর হিসেবেই নয়, বীরভূমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন হিসেবেও নতুন পরিচয় পেতে পারে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments