
নিউজ ডেস্ক: টানা বৃষ্টির জেরে দ্রুত বাড়ছে কোপাই নদীর জলস্তর। আর সেই জলের চাপেই বীরভূমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান কঙ্কালীতলা মন্দির চত্বরে ঢুকে পড়েছে নদীর জল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মন্দিরের বিস্তীর্ণ অংশ এখন জলমগ্ন। কোথাও কোথাও জলের উচ্চতা কোমর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে আপাতত সাধারণের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। মন্দিরের সামনে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড।
বীরভূমের কঙ্কালীতলা শুধু স্থানীয় মানুষের কাছে নয়, বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান। সতীপীঠ হিসেবে পরিচিত এই মন্দিরে সারা বছরই বহু ভক্তের আনাগোনা থাকে। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতিতে আপাতত সেই চেনা ছবি বদলে গিয়েছে। জল ঢুকে পড়ায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে নিয়মিত দর্শন ও পুজো দেওয়ার সুযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিন ধরে বীরভূমের বিভিন্ন এলাকায় লাগাতার বৃষ্টি হয়েছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কোপাই নদীর জল। নদীর জলস্তর বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত মন্দির চত্বরেও ঢুকে পড়ে। বর্তমানে মন্দিরের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায়।
তবে এখনও পর্যন্ত দেবী কঙ্কালীর গর্ভগৃহে জল ঢোকেনি বলেই জানা যাচ্ছে। সেটিই আপাতত কিছুটা স্বস্তির খবর। কিন্তু জল যদি আরও বাড়ে, তা হলে গর্ভগৃহও জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতির অবনতি হলে দেবীর বিগ্রহকে গর্ভগৃহ থেকে সরিয়ে কাছাকাছি শিবমন্দিরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে বলে মন্দির কর্তৃপক্ষ সূত্রে খবর। তবে আপাতত সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। জলস্তরের গতিবিধির উপর নজর রাখছেন প্রশাসন এবং মন্দির কর্তৃপক্ষ।
নিরাপত্তার কারণেই মন্দিরে সাধারণের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। পুলিশের তরফে মন্দিরের প্রবেশপথের সামনে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। ভক্ত এবং পর্যটকদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক মানুষকেই ফিরে যেতে হচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মন্দির চত্বরের স্বাভাবিক কাজকর্মও কার্যত ব্যাহত হয়েছে।
কঙ্কালীতলা মন্দিরের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও জল ঢোকার ফলে উদ্বেগ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে কঙ্কালীতলা শ্মশানকে ঘিরে। শ্মশান চত্বরেও নদীর জল ঢুকে পড়েছে। বৈদ্যুতিক চুল্লির নীচে জল জমে যাওয়ায় আপাতত সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে মৃতদেহ সৎকারের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে স্থানীয় মানুষকে।
একদিকে মন্দিরে পুজো-দর্শন বন্ধ, অন্য দিকে শ্মশানে সৎকার পরিষেবা ব্যাহত—একই সঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা বিপর্যস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এলাকায়।
শুধু কঙ্কালীতলা নয়, বীরভূমের বোলপুর শহর এবং সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকাতেও জলযন্ত্রণা অব্যাহত রয়েছে। শহরের ৩, ৪, ৫ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একাধিক এলাকা এখনও জলমগ্ন। কোথাও আগে জমে থাকা জল নামতে না নামতেই নতুন করে জল ঢুকেছে। ফলে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
রাস্তাঘাট জলমগ্ন হয়ে পড়ায় দৈনন্দিন যাতায়াতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলিতে বসতবাড়ি এবং দোকানপাটে জল ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও জল সরানোর কাজ চললেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এরই মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জলাধারগুলি থেকে জল ছাড়ার খবর। ডিভিসি সূত্রে জানা গিয়েছে, মাইথন এবং পাঞ্চেত জলাধার থেকে বিপুল পরিমাণ জল ছাড়া হয়েছে। দুই জলাধার মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার কিউসেক জল ছাড়ার কথা জানা গিয়েছে। পাশাপাশি দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকেও জল ছাড়া হচ্ছে। ফলে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক নদীতে জলস্তর আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাঁকুড়া, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি এবং হাওড়া—এই চার জেলাকে সতর্ক করেছে নবান্ন। প্রশাসনের তরফে নদী ও নিচু এলাকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যেই বীরভূমের কুয়ে নদী থেকে শুরু করে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালের শিলাবতী—একাধিক নদীতে জলস্তর বাড়ছে। তার প্রভাব পড়েছে ঘাটালেও। শহরের বিভিন্ন এলাকায় জল ঢুকে পড়েছে। কোথাও রাস্তা, কোথাও রাজ্য সড়ক, আবার কোথাও চাষের জমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। একাধিক দোকানেও জল ঢোকার খবর মিলেছে। ফলে ব্যবসা এবং সাধারণ জীবনযাত্রা দু’দিকেই প্রভাব পড়ছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতিতেও এখনই বড় স্বস্তির ইঙ্গিত নেই। দক্ষিণবঙ্গে আজ বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে বলে পূর্বাভাস থাকলেও বিচ্ছিন্ন ভাবে বৃষ্টি চলার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সেখানেও সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
ফলে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন নদীতে জলস্তর কখন কমবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কোপাই নদীর জল যদি আরও বাড়তে থাকে, তা হলে কঙ্কালীতলা মন্দিরের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। গর্ভগৃহে জল ঢোকে কি না, মন্দির চত্বরে জলস্তর কতটা বাড়ে এবং শ্মশানের পরিষেবা কবে স্বাভাবিক হয়—এই মুহূর্তে সেই দিকেই নজর প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি কঙ্কালীতলার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আবেগও গভীর ভাবে জড়িয়ে। তাই মন্দিরকে জলমুক্ত রাখা এবং পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আপাতত সাধারণের প্রবেশ বন্ধ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোপাইয়ের জল কমলেই কঙ্কালীতলার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে—এই আশাতেই অপেক্ষা করছেন স্থানীয়রা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments