
নিউজ ডেস্ক: টানা প্রবল বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত বীরভূমের বোলপুর। গত প্রায় ৪৮ ঘণ্টার অবিরাম বৃষ্টিতে শহরের একাধিক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বোলপুর পুরসভার অন্তত চারটি ওয়ার্ডে জল ঢুকে বহু পরিবার ঘরবন্দি বলে অভিযোগ। কোথাও রাস্তা ডুবে গিয়েছে, কোথাও আবার নিকাশি নালার জল উপচে ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভিতরে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী বাথরুম থেকে বেডরুম—ঘরের বিভিন্ন অংশেই ঢুকে পড়েছে জল।
বোলপুরের একাধিক এলাকায় জল জমার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টানা বৃষ্টি হলেই বছরের পর বছর একই ছবি দেখা যায়। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই তাঁদের দাবি। এবারও ভারী বৃষ্টির জেরে সেই সমস্যাই আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন পুরসভার ৩, ৪, ৫ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। বিভিন্ন রাস্তায় জমে থাকা জল চলাচলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু বাড়ির নীচতলায় জল ঢুকে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত থমকে গিয়েছে। শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থদের নিয়ে বিশেষ উদ্বেগে রয়েছেন পরিবারের সদস্যেরা।
জল জমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও তৈরি হয়েছে আশঙ্কা। জলমগ্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক তার ও সংযোগ নিয়ে দুর্ঘটনার ভয় করছেন বাসিন্দারা। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দ্রুত জল সরানো এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বোলপুরের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোগুলির আশপাশেও বৃষ্টির প্রভাব দেখা গিয়েছে। গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহের চত্বরেও জল ঢোকার খবর সামনে এসেছে। শহরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় নিকাশি জল জমে থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
তবে শুধু বোলপুর নয়, টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায়। বাঁকুড়াতেও প্রবল বৃষ্টির জেরে নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। দ্বারকেশ্বর নদীর উপর ভাদুল সেতু জলমগ্ন হয়ে পড়ায় আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
বাঁকুড়া থেকে ওন্দার দিকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেতুর উপর দিয়ে জল বইতে শুরু করায় নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রায় ২০টি গ্রামের বাসিন্দাদের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সেতু সংস্কার ও পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানানো হলেও সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পূর্ব মেদিনীপুরেও গত কয়েক সপ্তাহে ভারী বৃষ্টির জেরে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কেলেঘাই ও বাগুই নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় পটাশপুর ও ভগবানপুর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ জলমগ্ন হয়েছিল। অন্যদিকে সুবর্ণরেখা নদীর জল বাড়ায় রামনগরের একাধিক নিচু এলাকাতেও প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দেয়।
ঝাড়গ্রামেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নদীগুলির জলস্তর। তারাফেনি নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় ঢোলভাঙা এলাকায় প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডুলুং নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় জামবনির চিল্কিগড় এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কজওয়ে জলমগ্ন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়াও বিভিন্ন খাল ও জলপথের জল উপচে পড়ায় একাধিক রাস্তা দিয়ে যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে। ফেকো-গোপীবল্লভপুর রাজ্য সড়কের কিছু অংশেও জল জমে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
উজান থেকে জল ছাড়ার খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে। ঝাড়খণ্ডের গালুডি ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পর নিচু এলাকাগুলিতে নদীর জল আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি হয়েছে। ফলে ইতিমধ্যেই জলমগ্ন বোলপুর-সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বোলপুরের জলমগ্ন ওয়ার্ডগুলিতে পরিস্থিতি কতটা জটিল হবে? বাসিন্দাদের দাবি, আপাতত দ্রুত জল বের করার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে শহরের নিকাশি ব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। টানা বৃষ্টির মাঝে তাই বোলপুরের মানুষের নজর এখন আকাশের দিকে—আর প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় জলবন্দি বহু পরিবার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments