Homeঅন্যান্যশীত নয়, বসন্তেও হিমালয়ে ‘বিপদ’! বদলে যাচ্ছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার চরিত্র, বাড়ছে হড়পা বান-ভূমিধসের আশঙ্কা

শীত নয়, বসন্তেও হিমালয়ে ‘বিপদ’! বদলে যাচ্ছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার চরিত্র, বাড়ছে হড়পা বান-ভূমিধসের আশঙ্কা

নিউজ ডেস্ক :পশ্চিমী ঝঞ্ঝা মানেই এত দিন শীতকাল। হিমালয়ে তুষারপাত, উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৃষ্টি—এই পরিচিত আবহাওয়া ব্যবস্থার সঙ্গেই যেন জড়িয়ে ছিল
resizeplus_Himalaya-Landslides-Increasing-Flash-Floods-2026-08-6915507a2f0b56abf022a1fc3f951979-1200×800

নিউজ ডেস্ক :পশ্চিমী ঝঞ্ঝা মানেই এত দিন শীতকাল। হিমালয়ে তুষারপাত, উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৃষ্টি—এই পরিচিত আবহাওয়া ব্যবস্থার সঙ্গেই যেন জড়িয়ে ছিল ‘Western Disturbance’ বা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার নাম। কিন্তু জলবায়ুর চরিত্র বদলের সঙ্গে সেই পরিচিত ছবিতেও নাকি ফাটল ধরছে। শীতের গণ্ডি পেরিয়ে এ বার বসন্তেও হিমালয়ের আবহাওয়ায় বড় ভূমিকা নিতে পারে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। শুধু তাই নয়, এই আবহাওয়া ব্যবস্থা আগের তুলনায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে, বেশি জলীয়বাষ্প বহন করছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত বৃষ্টিপাতও হয়ে উঠছে আরও তীব্র।

আইআইটি রুরকির সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সময়কাল, গতিপথ এবং গঠন—তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের প্রবণতা স্পষ্ট। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রাক্-মৌসুমি সময়ে এই আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাব বাড়ার বিষয়টি গবেষকদের নজরে এসেছে। তাঁদের অনুমান, উষ্ণায়ন এবং বৃহত্তর বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের সঙ্গে এই বদলের যোগ থাকতে পারে।

সাধারণত শীতের সময়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন পশ্চিমী ঝঞ্ঝা পশ্চিম এশিয়া পেরিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ঢোকে। হিমালয় এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে তার প্রভাবে বৃষ্টি ও তুষারপাত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, এই ঝঞ্ঝা শুধু শীতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বসন্তের শুরু থেকে গ্রীষ্মের আগের সময়েও এর সক্রিয়তা বাড়ছে। ফলে এমন একটি সময়ে পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যখন প্রকৃতি এবং পরিকাঠামো—দু’টিই অন্য ধরনের আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে।

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার যাত্রাপথ যেন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছনোর আগে এই আবহাওয়া ব্যবস্থা বেশি পরিমাণে জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করতে পারছে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে বায়ুপ্রবাহের শক্তিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই সমস্ত কারণ একসঙ্গে কাজ করলে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সঙ্গে যুক্ত বৃষ্টির পরিমাণ যেমন বাড়তে পারে, তেমনই অল্প সময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টির ঘটনাও ঘটতে পারে।

আর এখানেই হিমালয় নিয়ে উদ্বেগ। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক। ঢালে অতিরিক্ত জল জমলে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। তার ফল হতে পারে ভূমিধস। কোথাও আবার স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ জল নেমে এলে তৈরি হতে পারে হড়পা বান। নদী-নালা এবং পাহাড়ি খরস্রোতা জলধারায় আচমকা জল বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে পাহাড়ি পরিকাঠামোর উপরেও। রাস্তা, সেতু, সুড়ঙ্গ, বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে শুরু করে পাহাড়ের গায়ে তৈরি বসতিগুলিও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে এমন এলাকায়, যেখানে পাহাড় কেটে রাস্তা বা নির্মাণকাজ হয়েছে, সেখানে ভারী বৃষ্টির অভিঘাত আরও গুরুতর হতে পারে। ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের পাশাপাশি পরিকাঠামো পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন বাড়ছে।

এই গবেষণার জন্য সাত দশকেরও বেশি সময়ের বৃষ্টিপাতের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই দীর্ঘ সময়ের তথ্যের মধ্যে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার আচরণে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ছবি ফুটে উঠেছে। গবেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল কোনও একটি বছরের ব্যতিক্রমী আবহাওয়া নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার দিকে নজর দিলে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার ঋতুভিত্তিক ভূমিকার পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আইআইটি রুরকির হাইড্রোলজি বিভাগের পিএইচডি গবেষক স্পন্দিতা মিত্র জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণের সময় পশ্চিমী ঝঞ্ঝার ঋতুভিত্তিক ভূমিকার পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং হঠাৎ চরম আবহাওয়ার যে ঘটনাগুলি দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে বৃহত্তর বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

গবেষক দলের অন্যতম সদস্য এবং আইআইটি রুরকির হাইড্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক অঙ্কিত আগরওয়ালের মতে, প্রাক্-মৌসুমি সময়ে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সময় এবং কাঠামোর পরিবর্তন বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রভাব শুধু বৃষ্টিপাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জলসম্পদ, চরম আবহাওয়ার ঘটনা এবং হিমালয় ও সংলগ্ন এলাকার দুর্যোগ-ঝুঁকির উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন আইআইটি রুরকির ডিরেক্টর প্রফেসর কে কে পন্থও। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, হিমালয়ের মতো পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকায় জলবায়ু সহনশীলতার পরিকল্পনাকে নতুন করে ভাবতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যকে দ্রুত নীতি নির্ধারণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার কাজে ব্যবহার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ, এই পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাসে থেমে থাকবে না। হিমালয়ের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এই অঞ্চলের বৃষ্টি এবং তুষারপাত বহু নদী ও জলসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু বৃষ্টির সময়, স্থান এবং তীব্রতা যদি বদলে যায়, তা হলে এক দিকে যেমন আচমকা বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে, অন্য দিকে দীর্ঘমেয়াদে জলসম্পদের পরিকল্পনাও আরও জটিল হয়ে উঠবে।

এই পরিস্থিতিতে গবেষকদের পরামর্শ, হিমালয়-সহ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় আরও উন্নত Dynamic Forecasting System, অঞ্চলভিত্তিক বিপদ মূল্যায়ন এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত পশ্চিমী ঝঞ্ঝার গতিবিধির উপর বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাস্তা, সেতু, বাঁধ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির সময় ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়ার সম্ভাবনাকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।

সব মিলিয়ে, আইআইটি রুরকির গবেষণা যেন একটি বড় বার্তা দিচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থ শুধু তাপমাত্রা বাড়া নয়। বদলে যেতে পারে বৃষ্টির সময়, আবহাওয়া ব্যবস্থার গতিপথ, জলীয়বাষ্পের পরিমাণ এবং চরম আবহাওয়ার ধরনও। আর হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিতে সেই বদল সামান্য হলেও তার প্রভাব হতে পারে অনেক বড়। শীতের বাইরে বসন্তেও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার বাড়তি সক্রিয়তা তাই আগাম সতর্ক হওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।


No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved