Homeরাজ্যমন্দারমণিতে ‘সানবার্ন’ ফেস্টিভ্যালে চরম বিশৃঙ্খলা! বৃষ্টির রাতে কান ফাটানো শব্দ, উদ্দাম নেশা ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে বিদ্ধ ‘রেভ পার্টি’

মন্দারমণিতে ‘সানবার্ন’ ফেস্টিভ্যালে চরম বিশৃঙ্খলা! বৃষ্টির রাতে কান ফাটানো শব্দ, উদ্দাম নেশা ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে বিদ্ধ ‘রেভ পার্টি’

নিউজ ডেস্ক: সকাল থেকেই আকাশের মুখ ছিল গোমড়া। বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে ধেয়ে আসা ঝোড়ো হাওয়া আর তার সঙ্গে প্রবল বর্ষণে
rev party

নিউজ ডেস্ক: সকাল থেকেই আকাশের মুখ ছিল গোমড়া। বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে ধেয়ে আসা ঝোড়ো হাওয়া আর তার সঙ্গে প্রবল বর্ষণে কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় সৈকত শহর মন্দারমণি। এই ভয়ঙ্কর দুর্যোগের মধ্যেই সেখানে অনুষ্ঠিত হতে চলা বিখ্যাত ‘সানবার্ন’ (Sunburn) মিউজিক ফেস্টিভ্যাল নিয়ে উন্মাদনার পারদ চড়ছিল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। বৃষ্টির দাপটে আদৌ অনুষ্ঠান হবে কি না, তা নিয়ে সকাল থেকে চরম সংশয় তৈরি হয়েছিল ফেস্টিভ্যালপ্রেমীদের মধ্যে। কিন্তু বিকেলে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমতেই, উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত মেলে। আর তার পরেই যে দৃশ্য তৈরি হল, তা বাংলার সংস্কৃতি, পর্যটন এবং আইনশৃঙ্খলার ইতিহাসে এক গভীর কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই হয়তো লেখা থাকবে। কাতারে কাতারে উচ্ছৃঙ্খল জনতার বাঁধভাঙা ভিড়, উদ্দাম নেশা, কান ফাটানো শব্দদানব এবং মহিলাদের চরম শ্লীলতাহানির অভিযোগে কার্যত এক ভয়ংকর রণক্ষেত্রে পরিণত হল মন্দারমণির ‘কে সি ভিউ রিসর্ট’ (K Sea View Resort)। এই রাতের ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বিনোদনের নামে ঠিক কতটা নিচে নামতে পারে আধুনিক ‘রেভ পার্টি’র সংস্কৃতি, যা দেখলে মনে হবে এ যেন আমাদের পশ্চিমবঙ্গের কোনও চেনা ছবি নয়, বরং ভিন রাজ্যের অজানা কোনও বন্য উল্লাস।

Table of Contents

    বাংলার পর্যটন মানচিত্রে মন্দারমণি বরাবরই একটি শান্ত, স্নিগ্ধ উইকেন্ড বা সপ্তাহান্তের ডেস্টিনেশন হিসেবে পরিচিত। পরিবার-পরিজন নিয়ে সমুদ্রের গর্জন শোনার জন্যই মানুষ এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু সানবার্নের এই অনুষ্ঠান যেন সেই চেনা ছবিটাকে এক রাতের মধ্যে আছড়ে ফেলল এক অচেনা, ভয়াবহ বাস্তবতায়। অভিযোগ, এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কিছু প্রত্যক্ষদর্শী এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রিপোর্টের দাবি, ভিড়ের সংখ্যা নাকি ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল! যদিও এই বিশাল পরিসংখ্যানের সরকারি বা স্বাধীন কোনও সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ঘটনাস্থলের ভয়াবহ বর্ণনা এই দাবিকে খুব একটা অমূলক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে না। প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জমায়েতের জন্য কি আদৌ কোনও সঠিক পরিকাঠামো ছিল? কে গুনছিল এই ভিড়? আর কে-ই বা এই বিশাল জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিল? মনে হচ্ছে যেন, উদ্যোক্তাদের কাছে ‘আশা করি কিছু হবে না’-টাই ছিল একমাত্র প্ল্যান এ, প্ল্যান বি এবং প্ল্যান সি।

    টানা বৃষ্টি, রেভ পার্টি এবং হাজার হাজার উন্মত্ত মানুষের ভিড়— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিস্ফোরক ককটেল। ইনস্টাগ্রামের রিল বানানোর মতো রোমান্টিক বা ‘স্লো-মোশন’ বৃষ্টি এটা ছিল না। এ ছিল বাংলার সেই পরিচিত বর্ষা, যা মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ কাদা আর বিশৃঙ্খলায় ভরিয়ে দিতে পারে। সেই কাদামাখা মাঠেই চলল উদ্দাম উল্লাস। অভিযোগ, দর্শকদের একটা বড় অংশ ছিলেন চরম নেশাগ্রস্ত। শুধুমাত্র মদ্যপান নয়, প্রকাশ্যে গাঁজা সেবনের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে একাংশের বিরুদ্ধে। নিরাপত্তারক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে, বা কার্যত তাদের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে অবাধে ঢুকেছে নেশার সামগ্রী। এর সঙ্গে দোসর হয়েছিল শব্দের তাণ্ডব। দাবি করা হচ্ছে, শব্দের মাত্রা নাকি ২০০ ডেসিবেল ছুঁয়েছিল। এই তথ্যের বৈজ্ঞানিক সত্যতা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, তবে স্পিকারের কান ফাটানো আওয়াজে যে সংগীতের মূর্ছনা নয়, বরং স্নায়ুতন্ত্রের ওপর আক্রমণ চলছিল, তা একবাক্যে স্বীকার করছেন ভুক্তভোগীরা। মনে হচ্ছিল, বেস (Bass) যেন নিজেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, আর গোটা ফেস্টিভ্যাল পরিণত হয়েছে ‘রেভ ২.০: ব্যাটল রয়্যাল – মন্দারমণি এডিশন’-এ।

    তবে এই বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে অন্ধকার এবং নিন্দনীয় দিকটি ছিল মহিলাদের নিরাপত্তা লঙ্ঘন। কোনও প্রচারমূলক চকচকে পোস্টারে বা টিকিটের শর্তাবলীতে এই কথাগুলো লেখা থাকে না। ঘন ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মহিলাদের চরম হয়রানি, নির্যাতন এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভিড়ের মধ্যে মহিলাদের ব্যক্তিগত পরিসরটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আধুনিক পার্টি সংস্কৃতির এই বিকৃত রূপটি প্রমাণ করে যে, নেশার ঘোরে অনেকেই ‘সম্মতি’ বা ‘কনসেন্ট’-এর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সুবিধামতো ঐচ্ছিক বলে মনে করেন। এখানেই সমাজের সেই পচা গলা মানসিকতা— “ছেলেরা তো ওরকম করবেই” বা “বয়েজ উইল বি বয়েজ” (boys will be boys) প্রবাদটিকে চিরতরে কবর দেওয়ার সময় এসেছে। একটি মিউজিক ফেস্টিভ্যালের রিস্টব্যান্ড বা টিকিট কাটা মানেই কারও শরীরে অনিচ্ছাকৃতভাবে হাত দেওয়ার লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া নয়। ভিড়, মদ, গাঁজা বা হরমোনের দোহাই দিয়ে এই জঘন্য অপরাধমূলক আচরণকে কোনওভাবেই ছাড় দেওয়া যায় না।

    এই ঘটনা আরও একটি বৃহত্তর এবং সমাজতাত্ত্বিক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বাংলা ঠিক কোন দিকে এগোচ্ছে? জেন-জেড (Gen-Z) প্রজন্মের পার্টি কালচার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বদলাচ্ছে। রেভ, ইডিএম (EDM), আফটার-পার্টি, ভাইব (Vibe), ট্রিপিং (Tripping)— এই শব্দগুলো এখন তরুণ প্রজন্মের দৈনন্দিন অভিধানের অপরিহার্য অংশ। “ব্রো, এটা তো মাত্র এক রাতের ব্যাপার”— এই বিপজ্জনক মানসিকতা নিয়েই তৈরি হচ্ছে এক নতুন অ্যালকোহল ও মাদক সংস্কৃতি। ইনস্টাগ্রাম বা স্ন্যাপচ্যাটের অ্যালগরিদম কেবল নিয়নের আলো আর গ্ল্যামার ভালোবাসে। সেখানে কেউ বমি করার ছবি দেয় না, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যায় না, নির্যাতিতা মেয়েটির ট্রমা বা আতঙ্কিত বাবা-মায়ের নির্ঘুম উদ্বেগের কোনও জায়গা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার এই মোহময়ী দুনিয়ার আড়ালে তরুণ সমাজের একাংশের মধ্যে মাদক ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ বস্তু থেকে লাইফস্টাইলের একটা সাধারণ আনুষঙ্গিক বস্তুতে পরিণত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ংকর সংকেত।

    তরুণরা পার্টি করবে, সংগীতের তালে আনন্দ করবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, এই উদ্দাম সংস্কৃতির যে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটছে, তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য কি বাংলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মাদকবিরোধী পরিকাঠামো আদৌ প্রস্তুত? ৬০ হাজার মানুষের জমায়েতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা মন্দারমণির এই ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে। উৎসবের শেষে, চরম বিশৃঙ্খলা আর ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর পুলিশি পদক্ষেপ বা দু-একজনকে গ্রেপ্তার করাটা কোনও সফল মাদকবিরোধী বা প্রশাসন চালানোর কৌশল হতে পারে না। ওটা স্রেফ ড্যামেজ কন্ট্রোল বা ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ। মন্দারমণির এই ‘সানবার্ন’ ফেস্টিভ্যাল প্রশাসনের কাছে একটি বিরাট সতর্কবার্তা দিয়ে গেল। সময় থাকতে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না নিলে, বাংলার পর্যটন এবং সমাজের এই অবক্ষয় যে এক গভীর খাদের দিকে এগোবে, তা বলাই বাহুল্য।

    No Comments

    তাজা খবর