Homeবাঁকুড়াভরতপুরপটচিত্রের রঙে রাখির বন্ধন, ভরতপুরে লোকশিল্পের সঙ্গে উৎসবের অভিনব মেলবন্ধন

পটচিত্রের রঙে রাখির বন্ধন, ভরতপুরে লোকশিল্পের সঙ্গে উৎসবের অভিনব মেলবন্ধন

নিউজ ডেস্ক:ভাই-বোনের সম্পর্কের চিরন্তন উৎসব রাখি পূর্ণিমা। সেই উৎসবের আবেগের সঙ্গে যখন মিশে যায় বাংলার নিজস্ব লোকশিল্প, তখন তৈরি হয়
পটচিত্রের রঙে ভরতপুরে রাখির উৎসব

নিউজ ডেস্ক:ভাই-বোনের সম্পর্কের চিরন্তন উৎসব রাখি পূর্ণিমা। সেই উৎসবের আবেগের সঙ্গে যখন মিশে যায় বাংলার নিজস্ব লোকশিল্প, তখন তৈরি হয় এক অন্যরকম সাংস্কৃতিক আবহ। বাঁকুড়ার ভরতপুর পটচিত্র শিল্পীদের গ্রামে এ বার ঠিক তেমনই এক অভিনব উদ্যোগ দেখা গেল। পটচিত্রের ঐতিহ্যবাহী রেখা, রং এবং নকশাকে ব্যবহার করে তৈরি হল রাখি। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে লোকশিল্পকে জুড়ে দেওয়ার এই উদ্যোগে একদিকে যেমন শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতার বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও কাছ থেকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

এই ভাবনাকে সামনে রেখেই ভরতপুর পটচিত্র গ্রামে আয়োজন করা হয়েছিল ‘Patachitra Rakhi Making Workshop & Art Materials Distribution Programme’। উদ্যোগটি নেয় LOKSANGHITA FOUNDATION। শুধুমাত্র রাখি তৈরি নয়, লোকশিল্পের সঙ্গে শিশুদের সরাসরি পরিচয় করানো এবং তাঁদের হাতে শিল্পচর্চার প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

সাধারণত রাখি উৎসব মানেই বাজারে তৈরি নানা ধরনের রাখি কেনা, ভাইয়ের হাতে তা পরিয়ে দেওয়া এবং পরিবারের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি করা। কিন্তু ভরতপুরে সেই চেনা ছবিটাই কিছুটা বদলে গেল। এখানে রাখি হয়ে উঠল শিল্পচর্চার একটি মাধ্যম। পটচিত্র শিল্পীদের নিজস্ব শিল্পভাষা, রঙের ব্যবহার এবং সূক্ষ্ম নকশা ছোট্ট রাখির পরিসরে নতুন মাত্রা পেল।

রাখি তৈরির কর্মশালায় হাতেকলমে শিক্ষা

এই কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ ছিল রাখি তৈরির কর্মশালা। সেখানে শিশুদের সামনে বসে পটশিল্পীরা তাঁদের কাজের পদ্ধতি তুলে ধরেন। পটচিত্র কী ভাবে তৈরি হয়, একটি নকশাকে কী ভাবে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ শিল্পকর্মে পরিণত করা যায় এবং সীমিত জায়গার মধ্যে রেখা ও রঙের সঠিক ব্যবহার কী ভাবে একটি সাধারণ নকশাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে—শিশুদের সামনে সেই প্রক্রিয়াই তুলে ধরা হয়।

পটচিত্রের নিজস্ব শিল্পরীতি ছোট একটি বৃত্তাকার রাখির মধ্যে কী ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটিও ছিল কর্মশালার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি কাজ দেখার ফলে শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হয় কৌতূহল। বই বা ছবি দেখে কোনও শিল্পকে জানার চেয়ে শিল্পীর হাতের কাজ সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা যে অনেক বেশি আকর্ষণীয়, কর্মশালায় তারই প্রমাণ মিলেছে।

শিশুরাও শুধু দর্শক হয়ে থাকেনি। নিজের হাতে রাখির নকশা তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে তারা। ফলে উৎসবের একটি সামগ্রী তৈরি করার পাশাপাশি নিজেদের সৃজনশীল ভাবনাকে প্রকাশ করার জায়গাও পেয়েছে ছোটরা।

শিল্পসামগ্রী দিয়ে উৎসবের পরেও সৃজনশীলতার সুযোগ

কর্মসূচির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিশুদের হাতে বিভিন্ন ধরনের শিল্পসামগ্রী তুলে দেওয়া। আয়োজকদের ভাবনা ছিল, কর্মশালার দিনটুকু শেষ হয়ে গেলেই যেন শিশুদের শিল্পচর্চা থেমে না যায়। বরং হাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ থাকলে তারা পরবর্তীতেও ছবি আঁকা, নকশা তৈরি কিংবা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরির চেষ্টা করতে পারবে।

শিশুদের হাতে আর্ট ম্যাটেরিয়াল তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাই শুধু উপহার দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসেনি। এর মধ্যে ছিল দীর্ঘমেয়াদি একটি সাংস্কৃতিক বার্তাও। আগামী প্রজন্ম যদি ছোট থেকেই স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়, তা হলে সেই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতে ধরে রাখার সম্ভাবনাও বাড়ে।

বিশেষ করে পটচিত্রের মতো লোকশিল্পের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পের ধারাবাহিকতা শুধু শিল্পীদের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দর্শক, শিক্ষার্থী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আগ্রহও একটি শিল্পরীতিকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নেয়।

উৎসব, ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মকে এক সুতোয় বাঁধার ভাবনা

LOKSANGHITA FOUNDATION-এর এই উদ্যোগের ভাবনা তাই শুধু অভিনব রাখি তৈরি করা নয়। রাখির মাধ্যমে উৎসবকে লোকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে শিশুদের সামনে একটি সাংস্কৃতিক শিক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকর্মী সংহিতা মিত্রের বক্তব্যেও উঠে এসেছে সেই ভাবনা। তাঁদের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র অতীতের কোনও শিল্পরীতিকে সংগ্রহশালা বা পুরনো স্মৃতির মধ্যে আটকে রাখা নয়। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যকে এমন ভাবে তুলে ধরা, যাতে তারা সেই শিল্পকে নিজেদের সৃজনশীলতার অংশ হিসেবে দেখতে পারে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ভরতপুরের পটচিত্র শিল্পীদের সঙ্গে রাখি উৎসবের এই যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। একটি রাখি এখানে একই সঙ্গে একাধিক সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে এটি ভাই-বোনের ভালবাসার বন্ধনকে প্রকাশ করছে। অন্যদিকে শিল্পী এবং শিল্পপ্রেমী, লোকঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যেও তৈরি করছে যোগাযোগের একটি নতুন পথ।

পটচিত্রের রঙে নতুন অর্থ পেল রাখি

বাংলার লোকশিল্পের নিজস্ব একটি চরিত্র রয়েছে। পটচিত্রের রেখা, রঙের ব্যবহার এবং বিষয়ভিত্তিক নকশা এই শিল্পকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় দেয়। সেই শিল্পভাষাকে রাখির মতো ছোট একটি শিল্পবস্তুর মধ্যে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে সৃজনশীল একটি প্রয়াস।

ভরতপুরের এই কর্মসূচিতে তাই রাখি শুধু একটি উৎসবের সামগ্রী হয়ে থাকেনি। সেটি হয়ে উঠেছে শিল্প ও সংস্কৃতির বাহক। শিশুদের তৈরি বা শিল্পীদের কাছ থেকে শেখা প্রতিটি নকশার মধ্যে যেমন উৎসবের আবেগ ছিল, তেমনই ছিল বাংলার লোকশিল্পের পরিচয়।

আয়োজকদের মতে, এমন কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পীদের কাজের প্রতিও আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে শিশুদের বোঝানো যায়, তাঁদের চারপাশের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি এবং শিল্পের মধ্যেও রয়েছে অসংখ্য সৃজনশীল সম্ভাবনা।

ভরতপুরের এই উদ্যোগ সেই কারণেই শুধুমাত্র একটি রাখি কর্মশালা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি হয়ে উঠেছে উৎসবের সঙ্গে ঐতিহ্যের সংযোগ ঘটানোর একটি প্রয়াস। ভাই-বোনের ভালবাসার প্রতীক রাখির সুতোয় এ বার যেন বাঁধা পড়েছে শিল্পী, শিশু, লোকসংস্কৃতি এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাও।

বাঁকুড়ার ভরতপুরে রাখি পূর্ণিমার আবহে তাই এ বার অন্য রকম এক ছবি। পটচিত্রের রঙে রঙিন হয়েছে রাখির বন্ধন, শিল্পীর হাত ধরে নতুন প্রজন্ম পেয়েছে লোকশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার যে বার্তা এই কর্মসূচি দিয়েছে, সেটিই হয়তো এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved