Homeরাজ্যপঞ্জিকার ফেরে ১৭ নয় ১৮-তে বিশ্বকর্মা! বন্ধ কারখানার মরচে ধরা গেটে আজও বেঁচে শিল্পের আশা

পঞ্জিকার ফেরে ১৭ নয় ১৮-তে বিশ্বকর্মা! বন্ধ কারখানার মরচে ধরা গেটে আজও বেঁচে শিল্পের আশা

নিউজ ডেস্ক: আকাশে শরতের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, বাতাসে শিউলির হালকা সুবাস আর কাশফুলের দোলা— সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে এখন পুজোর আগমনী বার্তা। জন্মাষ্টমীর উৎসব দিয়ে যে পার্বণের মরশুম শুরু হয়েছিল,
viswkarma

নিউজ ডেস্ক: আকাশে শরতের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, বাতাসে শিউলির হালকা সুবাস আর কাশফুলের দোলা— সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে এখন পুজোর আগমনী বার্তা। জন্মাষ্টমীর উৎসব দিয়ে যে পার্বণের মরশুম শুরু হয়েছিল, গণেশ চতুর্থীর আরাধনা পেরিয়ে তা এবার এসে ঠেকেছে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার দুয়ারে। কিন্তু ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ রাখতেই সাধারণ মানুষের মনে একটা বড়সড় প্রশ্ন জেগেছে। বিশ্বকর্মা পুজো মানেই বাঙালির কাছে ১৭ সেপ্টেম্বরের এক অলিখিত ছুটির দিন। ঘুড়ি ওড়ানো আর কারখানার সাইরেনের শব্দে মেতে ওঠার দিন। অথচ এ বছর সেই চেনা ছকে তাল কেটেছে। পঞ্জিকার পাতায় ১৭ তারিখের বদলে বিশ্বকর্মা পুজো নির্ধারিত হয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর। কেন এই তারিখ বদল? এই প্রশ্ন যেমন মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে, তেমনই অন্যদিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে রাজ্যের ধুঁকতে থাকা শিল্পাঞ্চলগুলি। উৎসবের দিন বদল হলেও, বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনও বদল হয়নি।

হিন্দু শাস্ত্র ও জ্যোতিষ গণনা অনুযায়ী, সনাতন ধর্মের অধিকাংশ দেবদেবীর পুজোই চন্দ্র পঞ্জিকা বা চাঁদের তিথির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। যেমন দুর্গা পুজো, কালী পুজো বা জন্মাষ্টমী। চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে এই পুজোগুলির তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়। কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর সমীকরণটা একেবারেই আলাদা। এই পুজোর দিনক্ষণ চাঁদের গতির ওপর নির্ভর করে না, বরং তা সম্পূর্ণভাবে সৌর পঞ্জিকা বা সূর্যের গতির ওপর নির্ভরশীল। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, সূর্য যখন সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে, ঠিক সেই দিনটিকেই কন্যা সংক্রান্তি বা ভাদ্র সংক্রান্তি বলা হয়। আর এই ভাদ্র সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতেই মর্ত্যে পূজিত হন শিল্পের দেবতা বিশ্বকর্মা। ২০২৬ সালের সৌর পঞ্জিকার সুনির্দিষ্ট গণনা অনুযায়ী, এ বছর সূর্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করছে ১৭ সেপ্টেম্বর একেবারে গভীর রাতে অথবা ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরের দিকে। সূর্যের এই রাশি পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সময়ের ওপর ভিত্তি করেই এবার বিশ্বকর্মার আরাধনার দিনটি এক দিন পিছিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত হয়েছে।

তবে তারিখ বদলের এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এক নিদারুণ আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা। একসময় বিশ্বকর্মা পুজো মানেই ছিল শিল্পাঞ্চলগুলির অলিখিত মহোৎসব। কারখানার গেটে গেটে আলোর রোশনাই, ভোঁপুর শব্দ, মাইকে বাজতে থাকা হিট গান, আর শ্রমিকদের কবজি ডুবিয়ে খাওয়া-দাওয়া। বড় বড় লোহা লক্কড়ের কারখানা থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট লেদ মেশিন ঘর— সব জায়গাতেই ছিল সাজসাজ রব। কিন্তু আজ সেই চেনা ছবিতে চরম ভাটা পড়েছে। বিশ্বায়নের ধাক্কা, রুগ্ণ শিল্পনীতি আর অর্থনৈতিক মন্দার কোপে রাজ্যের বহু ছোট-বড় কলকারখানা আজ চিরতরে বন্ধ। যে কারখানাগুলোর চিমনি দিয়ে একসময় অহংকার আর সমৃদ্ধির ধোঁয়া বেরোত, আজ সেই কারখানার লোহার গেটগুলোতে জং ধরেছে। বড় বড় নামজাদা কোম্পানিগুলোতে নিয়ম রক্ষার খাতিরে নমো নমো করে পুজো হলেও, আগের মতো সেই জাঁকজমক, বোনাসের আনন্দ আর শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আজ কার্যত ইতিহাস।

তবুও প্রবাদে আছে, ‘আশায় বাঁচে চাষা’। এই কথাটি শুধু কৃষকদের জন্যই নয়, খেটে খাওয়া শ্রমিকদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। যাঁদের কর্মক্ষেত্র আজ তালাবন্ধ, যাঁদের রোজগার তলানিতে এসে ঠেকেছে, তাঁরাও আশায় বুক বেঁধে বিশ্বকর্মার চরণে অঞ্জলি দেন। চাঁদা তুলে, নিজেদের জমানো সামান্য পুঁজি এক করে তাঁরা আজও দেবশিল্পীর পুজো করেন। তাঁদের মনে একটাই সুপ্ত প্রার্থনা— যদি যন্ত্রের দেবতার কৃপায় আবার কারখানার বন্ধ গেট খুলে যায়! যদি আবার মেশিনের চাকা ঘোরে, আবার অন্নসংস্থানের একটা নতুন দিশা পাওয়া যায়! শিল্পের এই নিদারুণ আকালের দিনেও কেবল বেঁচে থাকার আর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল তাগিদেই বহু শ্রমিক পরিবার নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুজোর আয়োজনে মেতে ওঠেন।

কিন্তু সেই আশায় জল ঢেলে দিচ্ছে বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। পুজোর বাজার করতে গিয়ে রীতিমতো ছ্যাঁকা খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ফলমূল, মিষ্টি, ফুল, পুজোর উপকরণ থেকে শুরু করে প্যান্ডেলের সাজসজ্জা— সবকিছুরই দাম আকাশছোঁয়া। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে প্রতিমার দামে। মৃৎশিল্পীরা জানাচ্ছেন, মাটি, বাঁশ, খড়, রং এবং মজুরি— প্রতিটি জিনিসের খরচ গত কয়েক বছরের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই বিশ্বকর্মা প্রতিমার দাম বাড়াতে হয়েছে তাঁদের। আর এই বাড়তি দাম মেটাতে গিয়ে কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ পড়ছে পুজোর উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিকদের। পকেটের রেস্ত ফুরিয়ে আসায় অনেকেই পুজোর বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ১৭ না ১৮ তারিখ— পঞ্জিকার এই বিতর্কের চেয়েও আজ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের ময়দানে দাঁড়িয়েই একরাশ মনখারাপ আর বুকভরা আশা নিয়ে আরও একটা বিশ্বকর্মা পুজোর সাক্ষী হতে চলেছে বাংলা।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved