Last updated: September 18th, 2026 at 11:27 pm

নিউজ ডেস্ক: ভাদ্রের মেঘমুক্ত আকাশে যখন শরতের আগমনী সুর একটু একটু করে বাজতে শুরু করেছে, কাশবনে যখন হাওয়ার দোলা, ঠিক তখনই বাংলার লোকসংস্কৃতির এক আদিম ও অকৃত্রিম উৎসবের রঙে মেতে উঠল নদীয়া জেলার শান্তিপুর। আধুনিকতার ইঁদুরদৌড়ে যখন হারিয়ে যেতে বসেছে মাটির কাছাকাছি থাকা উৎসবগুলো, তখন শান্তিপুরের রামনগর চর পুরাতন পাড়া যেন এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস। এই ভাদ্রের দিনগুলোতেই সেখানে আবহমানকাল ধরে শুরু হয়ে যায় আদিবাসী ও মূলবাসী জনজাতির অন্যতম প্রধান উৎসব ‘করম পরব’। আর এই উৎসবের প্রথম ও অত্যন্ত পবিত্র ধাপ হলো ‘জাওয়া তোলা’। সম্প্রতি রামনগর চরের ঐতিহ্যবাহী ঝুমুরিয়া আখড়ায় এই জাওয়া তোলার পুণ্য আচারের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকে কাঠি পড়ে গেল এ বছরের করম পরবের। আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর, ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে অত্যন্ত সাড়ম্বরে উদযাপিত হবে মূল করম পুজো এবং বর্ণাঢ্য উৎসব।
কৃষিভিত্তিক বাংলার গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতির আরাধনাই হলো প্রাচীনতম ধর্ম। করম পরব মূলত সেই প্রকৃতিরই উৎসব। শস্যের প্রাচুর্য, পরিবারের মঙ্গল এবং ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনকে দৃঢ় করতেই এই উৎসব পালন করা হয়। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীতে এই আদিবাসী লোকউৎসবটি মহাসমারোহে পালিত হলেও, এর প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে যায় মূল পূজার ৫ থেকে ৭ দিন আগে থেকেই। আর এই প্রস্তুতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ভক্তিপূর্ণ আচারটির নামই হলো ‘জাওয়া তোলা’ বা ‘জাওয়া পাতা’। স্থানীয় বাসিন্দা এবং লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এই আচারটি নিছকই কোনও প্রথা নয়, বরং এর পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে কৃষিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার গভীর এক দর্শন এবং উর্বরতার প্রতীকী আরাধনা।
কীভাবে পালিত হয় এই জাওয়া তোলার আচার? নিয়ম অনুযায়ী, উৎসবের সূচনাপর্বের এই দিনটিতে গ্রামের কুমারী মেয়েরা অত্যন্ত শুদ্ধাচারে ব্রত পালন করেন। ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই শয্যা ত্যাগ করেন তাঁরা। এরপর আধুনিক ব্রাশ বা পেস্টের বদলে আদিম প্রথা মেনে শালগাছের ডাল কেটে তৈরি করা দাঁতন দিয়ে মুখগহ্বর পরিষ্কার করা হয়। এরপর দল বেঁধে তাঁরা ছুটে যান গ্রামের নিকটবর্তী নদী কিংবা স্বচ্ছ জলের পুকুরে। সেখানে শুদ্ধ চিত্তে স্নান সেরে পবিত্র বস্ত্র পরিধান করে শুরু হয় মূল কাজ। স্নান শেষে কুমারী মেয়েরা সঙ্গে করে নিয়ে আসা বাঁশের তৈরি চুপড়ি, ঝুড়ি অথবা বেতের ডালায় নদী বা পুকুর পাড়ের পরিষ্কার বালি বা মাটি সংগ্রহ করেন।
সেই পাত্রে পরম মমতায় রোপণ করা হয় নানা ধরনের রবিশস্যের বীজ। যার মধ্যে প্রধানত থাকে ধান, সর্ষে, ভুট্টা, কলাই, কুর্তি ইত্যাদি নানা রকম বীজ। এই বীজ বপন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকেই স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘জাওয়া পাতা’ বা ‘জাওয়া তোলা’। এই বীজগুলি আদতে নতুন প্রাণের প্রতীক। উর্বর মাটিতে বীজ থেকে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়, ঠিক তেমনই প্রকৃতি যেন সারা বছর গ্রামকে শস্যে ও ফসলে ভরিয়ে রাখে, সেই ঐকান্তিক কামনাই করা হয় এই আচারের মাধ্যমে।
জাওয়া তোলার পর থেকে শুরু হয় আরেক মনমাতানো পর্ব। উৎসবের সূচনা থেকে শুরু করে একাদশী তিথিতে মূল পুজো পর্যন্ত প্রতি দিন সন্ধ্যায় এই অঙ্কুরিত শস্য বা জাওয়াকে ঘিরে এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়। গ্রামের কুমারী মেয়েরা ও মহিলারা প্রতিদিন সন্ধ্যায় জাওয়ার পাত্রটিকে ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়ান। এরপর শুরু হয় নাচ ও গান। করম ও জাওয়ার নিজস্ব লোকগীতি, ঝুমুর গান এবং মাদলের বোলে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা আখড়া প্রাঙ্গণ। বিশ্বাস করা হয়, মেয়েদের এই গানের সুরে এবং পরম যত্নে সেই অঙ্কুরিত শস্য বা জাওয়া ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। প্রকৃতির প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এই দৃশ্য যে কোনও মানুষের মনকে এক অনাবিল শান্তিতে ভরিয়ে তোলে।
রামনগর চরের ঝুমুরিয়া পরিবারের এক প্রবীণ সদস্য এবারের আয়োজন নিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, আধুনিকতার গ্রাস থেকে নিজেদের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি বছরের মতো এবারও রামনগর চর পুরাতন পাড়ার ঝুমুরিয়া আখড়ায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করম পরব আয়োজিত হচ্ছে। আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর মূল উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষ, দর্শনার্থী এবং লোকসংস্কৃতি প্রেমীদের এই বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চাক্ষুষ করতে সশ্রদ্ধ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে পরিবারের তরফে।
ইতিমধ্যেই জাওয়া তোলাকে কেন্দ্র করে গোটা রামনগর চর এলাকাজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ ও উৎসবের উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে প্রবীণরাও মেতে উঠেছেন এই প্রাণের উৎসবে। কংক্রিটের জঙ্গলে যখন মানুষের আবেগ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন শান্তিপুরের এই করম পরব যেন আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে— মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের উৎসব আসলে প্রকৃতিরই এক অনবদ্য বন্দনা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments