Homeকলকাতাতিলজলায় লিভ-ইন সঙ্গিনীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার! ৩ ঘণ্টার রহস্য ও প্রেমিকের পলায়নে ঘনীভূত ‘খুন’-এর তত্ত্ব

তিলজলায় লিভ-ইন সঙ্গিনীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার! ৩ ঘণ্টার রহস্য ও প্রেমিকের পলায়নে ঘনীভূত ‘খুন’-এর তত্ত্ব

নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ পাঁচ বছরের নিবিড় সম্পর্ক। একসঙ্গে পথ চলার শপথ নিয়ে এক ছাদের তলায় শুরু করেছিলেন লিভ-ইন। শুধু প্রেম
crime

নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ পাঁচ বছরের নিবিড় সম্পর্ক। একসঙ্গে পথ চলার শপথ নিয়ে এক ছাদের তলায় শুরু করেছিলেন লিভ-ইন। শুধু প্রেম নয়, একসঙ্গে ব্যবসা করারও স্বপ্ন দেখেছিলেন দু’জনে। কিন্তু সেই স্বপ্নের এমন এক মর্মান্তিক ও ভয়াল পরিণতি হবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি কেউ। ভরসা আর ভালোবাসার সেই পরিণতি যে মৃত্যু দিয়ে শেষ হবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ওড়িশার তরুণী চম্পা সেনাপতি। শনিবার ভোরে তিলজলা এলাকার এক অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা শহরে। আর এই মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরতে পরতে তৈরি হয়েছে রহস্যের এক ঘন কুয়াশা। আত্মঘাতী হয়েছেন তরুণী, নাকি তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পুলিশের অন্দরে। কারণ, তরুণীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ তাঁর লিভ-ইন সঙ্গীর বিরুদ্ধেই। এখানেই শেষ নয়, হাসপাতালে তরুণীকে ফেলেই রহস্যজনকভাবে সেখান থেকে বেপাত্তা হয়ে যান ওই যুবক ও তাঁর এক সাগরেদ। শেষ পর্যন্ত মৃতার দাদার দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তিলজলা থানার পুলিশ খুনের মামলা রুজু করে রবিবার সকালে অভিযুক্ত দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

Table of Contents

    পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত ওই তরুণীর নাম চম্পা সেনাপতি। ২৬ বছর বয়সি ওই তরুণীর আদি বাড়ি ওড়িশার কুজাঙ্গা থানা এলাকার অন্তর্গত বাবলাবাঁধায়। ভাগ্যের অন্বেষণে এবং রুটিরুজির টানে তিনি ওড়িশা ছেড়ে চলে এসেছিলেন তিলোত্তমা কলকাতায়। এখানে একটি পানশালায় নর্তকী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেই পানশালাতেই কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেন রাজা ওয়াসিম হোসেন। কর্মসূত্রেই রাজার সঙ্গে আলাপ হয় চম্পার। সেই আলাপ ক্রমশ গড়ায় বন্ধুত্বে এবং অচিরেই তা গভীর প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। প্রায় বছর পাঁচেকের দীর্ঘ পরিচয় তাঁদের। সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর তাঁরা দু’জনে একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সেই মতো তিলজলা থানা এলাকার পিকনিক গার্ডেন রোডের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তাঁরা স্বামী-স্ত্রীর মতো লিভ-ইন করতে শুরু করেন। শুধু একসঙ্গে থাকাই নয়, ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা দু’জনে মিলে একটি ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। বছর দু’য়েক আগে নিজেদের জমানো মিলিত মূলধনে তাঁরা একটি পানশালা কেনেন। সেই ব্যবসার লভ্যাংশ তাঁরা দু’জনেই সমান ভাগে ভাগ করে নিতেন। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সুখের বলেই মনে হতো।

    কিন্তু সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সম্প্রতি তাঁদের এই দীর্ঘদিনের সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করে। ঠিক কী কারণে তাঁদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে প্রাথমিক তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, দুজনের মধ্যে অশান্তি এতটাই চরমে উঠেছিল যে, গত কয়েকদিন ধরে তিলজলার ওই লিভ-ইন ফ্ল্যাটে থাকছিলেন না অভিযুক্ত রাজা। তিনি অন্যত্র থাকছিলেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় এক চরম মর্মান্তিক ঘটনা। ১৫ আগস্ট ভোর ৩টে নাগাদ আচমকাই ওড়িশায় থাকা চম্পার দাদা রঞ্জন সেনাপতির কাছে একটি ফোন আসে। ফোনটি করেছিলেন চম্পারই এক বান্ধবী। আর সেই ফোনেই রঞ্জন তাঁর আদরের বোনের এই আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ পান। তাঁকে জানানো হয় যে, ফ্ল্যাটের ঘর থেকে চম্পার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনি নাকি আত্মঘাতী হয়েছেন।

    এই খবর পাওয়া মাত্রই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে রঞ্জনের। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, গত ১৩ আগস্ট শেষবার ফোনে বোনের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তখন চম্পার কথায় কোনও অস্বাভাবিকতা বা অবসাদের সুর তিনি টের পাননি। এরপর থেকে একাধিকবার বোনকে ফোন করলেও তাঁর মোবাইল ক্রমাগত সুইচড অফ পাওয়া যায়। বোনের আত্মহত্যার খবর পেয়ে রঞ্জন বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি ওড়িশা থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পৌঁছনোর পরেই রঞ্জনের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। পরতে পরতে খুলতে থাকে রহস্যের জট। রঞ্জনের কথায়, তিনি ভোর ৩টে নাগাদ ফোনে বোনের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলেন। কিন্তু হাসপাতালের নথিপত্র সম্পূর্ণ অন্য কথা বলছে। সেই নথি অনুযায়ী, সকাল পৌনে ৬টা নাগাদ চম্পাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে আসেন তাঁর লিভ-ইন পার্টনার রাজা। রাজার সঙ্গে সেই সময় উপস্থিত ছিলেন তাঁদেরই গাড়িচালক মহম্মদ শাহিদ।

    এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি। মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার সময় ভোর ৩টে, আর হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় সকাল পৌনে ৬টা। মাঝের এই প্রায় তিন ঘণ্টা সময় চম্পার মৃতদেহ নিয়ে রাজা ও তাঁর সঙ্গী ঠিক কী করছিলেন? কেনই বা হাসপাতালে আনতে এত দীর্ঘ সময় বিলম্ব হল? রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন রঞ্জন হাসপাতালে পৌঁছান। তিনি সেখানে পৌঁছনোর অনেক আগেই চম্পার মৃতদেহ হাসপাতালে ফেলে রেখে কার্যত চম্পট দেন রাজা এবং গাড়িচালক শাহিদ। তাঁদের এই পলায়নই মৃতার দাদার সন্দেহকে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রঞ্জনের স্পষ্ট অভিযোগ, তাঁর বোন কোনওভাবেই আত্মহত্যা করেননি। তাঁকে রীতিমতো পরিকল্পনা করে গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে খুন করা হয়েছে এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যার রূপ দিতেই দেহটিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। চম্পার গলায় যে গভীর ক্ষতের দাগ রয়েছে, তা দেখেই তাঁর দাদার বদ্ধমূল ধারণা যে এটি একটি ঠাণ্ডা মাথার খুন।

    এরপরই আর কালক্ষেপ না করে সোজা তিলজলা থানায় গিয়ে রাজা ওয়াসিম হোসেন এবং মহম্মদ শাহিদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের করেন রঞ্জন। তাঁর সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তৎপর হয় লালবাজার ও তিলজলা থানার পুলিশ। শনিবার রাতের পর রবিবার সকালেই গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযুক্ত দু’জনকে গ্রেপ্তার করেন তদন্তকারীরা। লালবাজার সূত্রে খবর, ধৃতদের নাম রাজা ওয়াসিম হোসেন ও মহম্মদ শাহিদ। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদেহটি উদ্ধার করে ইতিমধ্যেই ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হাতে এলে তবেই পরিষ্কার হবে যে চম্পাকে সত্যিই খুন করা হয়েছিল কি না, নাকি তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। রবিবারই ধৃত দুই অভিযুক্তকে আলিপুর আদালতে পেশ করা হয়। আদালতে সরকারি আইনজীবী শুভাশিস ভট্টাচার্য অভিযুক্তদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার জোরদার সওয়াল করেন। তিনি বিচারককে জানান, এই ঘটনার নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে অভিযুক্তদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত জরুরি। বিচারক সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। আপাতত পুলিশি ঘেরাটোপেই জেরা চলছে রাজা ও শাহিদের। কীভাবে দীর্ঘদিনের প্রেম পরিণতি পেল এমন এক মর্মান্তিক মৃত্যুতে, এখন তারই উত্তর খুঁজছে প্রশাসন।

    No Comments

    তাজা খবর