Homeনদিয়ারানাঘাটডিজিটাল যুগেও বইয়ের টানে ভিড়! ১৯৩১ থেকে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে রানাঘাটের কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগার, ভরসা চাকরিপ্রার্থীদেরও

ডিজিটাল যুগেও বইয়ের টানে ভিড়! ১৯৩১ থেকে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে রানাঘাটের কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগার, ভরসা চাকরিপ্রার্থীদেরও

resizeplus_Untitled Design (11)

নিউজ ডেস্ক : স্মার্টফোনের পর্দায় এখন হাতের মুঠোয় হাজার হাজার বই। অনলাইনে পড়াশোনা, ভিডিয়ো ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি—সময় বদলের সঙ্গে বদলে গিয়েছে জ্ঞানচর্চার পদ্ধতিও। কিন্তু তার পরেও বইয়ের পাতার গন্ধ আর নিরিবিলি পরিবেশে বসে পড়ার আকর্ষণ যে একেবারে ফুরিয়ে যায়নি, তারই জীবন্ত উদাহরণ নদিয়ার রানাঘাটের অনুলিয়া কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগার। প্রায় ৯৫ বছর ধরে গ্রামের মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করে চলেছে এই গ্রন্থাগার।

শুধু সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে নয়, বর্তমানে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া যুবক-যুবতীদের কাছেও এই পুরনো পাঠাগারটি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বই থেকে শুরু করে ইতিহাস, সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনি—প্রায় ১৬ হাজার বইয়ের বিশাল সম্ভার নিয়ে এখনও সক্রিয় এই গ্রন্থাগার। শান্ত পরিবেশে বসে পড়াশোনার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় বই এক জায়গায় পাওয়ার সুবিধাই ধীরে ধীরে বাড়াচ্ছে পাঠাগারটির জনপ্রিয়তা।

স্বাধীনতার আগেই শুরু পথচলা

অনুলিয়া কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগারের ইতিহাস স্বাধীনতারও আগের। ১৯৩১ সালের ১ জানুয়ারি গ্রামীণ এই পাঠাগারের পথচলা শুরু হয়েছিল। সেই সময়ে আজকের মতো সহজে বই পাওয়া যেত না। গ্রামের মানুষের কাছে জ্ঞান ও শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম ছিল বই এবং পাঠাগার। স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই তখন গড়ে উঠেছিল এই গ্রন্থাগার।

সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পরিধি বাড়তে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় এক দশক পর, ১৯৫৭ সাল থেকে পাঠাগারটি সরকারি অনুদান পেতে শুরু করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পরিকাঠামো এবং বইয়ের সংগ্রহ ধীরে ধীরে আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়।

এই পাঠাগার তৈরির ইতিহাসে অনুলিয়া গ্রামের কৃতী সন্তান কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অবদান বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর দান করা জমির উপরেই গড়ে ওঠে পাঠাগারটি। পরবর্তী সময়ে তাঁর সন্তানরাও গ্রন্থাগারের জন্য সম্পত্তি দানপত্র করে দেন। পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়া সেই সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানটির এগিয়ে চলার পথ আরও মজবুত করে।

কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই পরবর্তীতে পাঠাগারের নামকরণ করা হয় অনুলিয়া কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগার।

১৬ হাজার বই, এক ছাদের নীচে নানা জগত

আজকের দিনে এই গ্রন্থাগারে রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার বই। বইয়ের বিষয়বৈচিত্র্যও যথেষ্ট বিস্তৃত। বাংলা সাহিত্য থেকে ইতিহাস, ঐতিহাসিক স্থান ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, গোয়েন্দা কাহিনি—পাঠকদের আগ্রহ অনুযায়ী নানা ধরনের বই রয়েছে এখানে।

তবে বর্তমানে পাঠাগারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। সরকারি চাকরির বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় একাধিক বই রয়েছে গ্রন্থাগারে। অনেক সময় বাজারের সাধারণ বইয়ের দোকানে যে বই সহজে পাওয়া যায় না, তারও সন্ধান মিলছে এই পুরনো পাঠাগারে।

ফলে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বহু ছাত্রছাত্রী নিয়মিত এই গ্রন্থাগারে আসছেন। কারও লক্ষ্য সরকারি দফতরে চাকরি, কারও আবার বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য। তাঁদের কাছে পাঠাগারটি শুধু বই নেওয়া বা পড়ার জায়গা নয়, বরং প্রস্তুতির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পরিসর।

সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭২৭

বর্তমানে অনুলিয়া কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগারের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৭২৭ জন। এই সংখ্যাই বলে দেয়, ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসার সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব এখনও কতটা।

বিশেষ করে পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত শান্ত পরিবেশের প্রয়োজন রয়েছে এমন পড়ুয়াদের কাছে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে সব সময় নিরিবিলি পরিবেশে পড়ার সুযোগ না থাকলেও পাঠাগারে এসে নির্দিষ্ট সময় ধরে পড়াশোনা করা যায়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বই হাতের কাছে পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে।

চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিভিন্ন বিষয়ের বই, সাধারণ জ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা এবং অন্যান্য সহায়ক সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। একসঙ্গে এত বই সংগ্রহ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। পাঠাগারের সংগ্রহ তাই তাঁদের প্রস্তুতির খরচ এবং পরিশ্রম—দুই-ই কমাতে সাহায্য করছে।

মডেল লাইব্রেরি করার ভাবনা

প্রায় এক শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই গ্রন্থাগারকে আরও আধুনিক ও উন্নত করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাঠাগারটিকে একটি মডেল লাইব্রেরি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।

শুধু বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো নয়, পড়ুয়াদের সঠিক দিশা দেখানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গাইডেন্স দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য কী ভাবে আরও কার্যকর পরিষেবা তৈরি করা যায়, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা চলছে।

ডিজিটাল যুগে গ্রন্থাগারগুলির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল পাঠকের অভ্যাসে পরিবর্তন। মোবাইল ফোন, ই-বুক এবং অনলাইন কনটেন্টের কারণে বই পড়ার পুরনো অভ্যাস অনেকটাই বদলে গিয়েছে। কিন্তু অনুলিয়ার এই পাঠাগার দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় বইয়ের ব্যবস্থা থাকলে এখনও মানুষ গ্রন্থাগারের দরজায় আসেন।

শুধু বই নয়, প্রজন্মের স্মৃতিও

অনুলিয়া কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগারের গুরুত্ব শুধু তার ১৬ হাজার বই কিংবা ৭২৭ জন সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় ৯৫ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এলাকার বহু মানুষের স্মৃতি। এক প্রজন্মের পড়া বই হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছেছে। বহু ছাত্রছাত্রী এই পাঠাগারে বসে পড়াশোনা করেছেন, কেউ হয়তো চাকরি পেয়েছেন, কেউ উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়েছেন।

আজ সেই ধারাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। বইয়ের বিষয়বস্তু বদলেছে, পড়াশোনার প্রয়োজন বদলেছে, চাকরির পরীক্ষার ধরনও বদলেছে। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন বদলায়নি।

তাই স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের যুগেও রানাঘাটের অনুলিয়ার এই পুরনো পাঠাগার নিজের গুরুত্ব ধরে রেখেছে। একদিকে প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিক প্রজন্মের প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেই এগোচ্ছে কেদারনাথ স্মৃতি পাঠাগার।

আগামী দিনে আরও উন্নত পরিকাঠামো, বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পড়ুয়াদের জন্য সঠিক গাইডেন্সের ব্যবস্থা হলে এই গ্রন্থাগার শুধু অনুলিয়া নয়, গোটা রানাঘাট এলাকার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে। প্রায় ৯৫ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠানটি গ্রামের মানুষের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাতে যাত্রা শুরু করেছিল, আজও তার দরজা খোলা—শুধু বইয়ের জন্য নয়, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার প্রস্তুতির জন্যও।


No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved