Homeকলকাতাম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে নিখুঁত প্রেমের ফাঁদ! বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লক্ষাধিক টাকা লুঠ, শ্রীঘরে ‘গুণধর’ পাত্র

ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে নিখুঁত প্রেমের ফাঁদ! বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লক্ষাধিক টাকা লুঠ, শ্রীঘরে ‘গুণধর’ পাত্র

নিউজ ডেস্ক: বর্তমান আধুনিক যুগে প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেক বেশি সহজ ও সাবলীল করে তুলেছে, ঠিক তেমনই এর অন্ধকারের
crime

নিউজ ডেস্ক: বর্তমান আধুনিক যুগে প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেক বেশি সহজ ও সাবলীল করে তুলেছে, ঠিক তেমনই এর অন্ধকারের দিকটি ডেকে আনছে চরম বিপদ। আজকাল ব্যস্ততার যুগে ঐতিহ্যবাহী ঘটকের মাধ্যমে বিয়ের পাত্র-পাত্রী খোঁজার রেওয়াজ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন জনপ্রিয় ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট বা জীবনসঙ্গী খোঁজার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। আর এই আধুনিক যুগের সুবিধাটিকেই এখন নিজেদের প্রতারণার নয়া এবং মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে একশ্রেণির অসাধু চক্র। ঠিক এমনই এক রোমহর্ষক, মর্মান্তিক এবং চাঞ্চল্যকর প্রতারণার শিকার হলেন বরানগরের এক উচ্চশিক্ষিত তরুণী। জীবনসঙ্গী খোঁজার একরাশ বুকভরা আশা নিয়ে ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি যে, ওই ওয়েবসাইট থেকেই তাঁর জীবনে নেমে আসবে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। বিয়ের ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই তরুণীর কাছ থেকে নগদ পাঁচ লক্ষাধিক টাকা এবং দু’টি বহুমূল্য মোবাইল ফোন অত্যন্ত সুকৌশলে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করল নারায়ণপুর থানার পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, ধৃত ওই প্রতারক যুবকের নাম দেবরাজ চৌধুরী। তার আদি বাড়ি বিহারের পাটনা শহরে।

Table of Contents

    পুলিশ এবং তরুণীর অভিযোগ সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েক মাস আগে বরানগরের বাসিন্দা ওই তরুণীর সঙ্গে ইন্টারনেটের একটি নামজাদা ম্যাট্রিমনিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রথম আলাপ হয় অভিযুক্ত দেবরাজের। ভার্চুয়াল জগতের সেই পরিচয় খুব দ্রুত গড়ায় ব্যক্তিগত পরিসরে। ওয়েবসাইটের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের মধ্যে মোবাইল নম্বর আদানপ্রদান করেন তারা। এরপর থেকেই শুরু হয় নিয়মিত দীর্ঘ কথোপকথন, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ চালাচালি এবং ভিডিও কল। দেবরাজ প্রথম থেকেই নিজেকে অত্যন্ত ভদ্র, মার্জিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত এক যুবক হিসেবে তরুণীর কাছে উপস্থাপন করেছিল। কথায় কথায় সে ওই তরুণীকে পাকাপাকিভাবে বিয়ের প্রতিশ্রুতিও দেয়। তরুণীও স্বাভাবিকভাবেই সেই মিথ্যে অভিনয়ে ভুলে গিয়ে বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে, দেবরাজই হতে চলেছে তাঁর আগামী জীবনের নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। প্রেমের গভীর মায়াজালে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়া ওই তরুণী ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, তাঁর জন্য কী ভয়ানক এবং সর্বনাশা এক ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে।

    সম্পর্ক একটু গভীর এবং বিশ্বাসের ভিত মজবুত হতেই দেবরাজ তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করে। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে সে তরুণীর আবেগ, ভালোবাসা এবং মানসিক দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগায়। হঠাৎ করেই একদিন সে তরুণীকে জানায় যে, তার ব্যবসায় বা ব্যক্তিগত জীবনে চরম এক আর্থিক সংকট চলছে এবং এই অপ্রত্যাশিত বিপদ থেকে চিরতরে উদ্ধার পেতে তার জরুরি ভিত্তিতে কিছু টাকার প্রয়োজন। যেহেতু দুজনের মধ্যে বিয়ের কথা একপ্রকার পাকা হয়ে গিয়েছিল এবং তরুণী দেবরাজকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন, তাই তিনি বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে রাজি হয়ে যান। পুলিশের কাছে দায়ের করা লিখিত অভিযোগে ওই তরুণী বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন, গত দু’মাস ধরে ধাপে ধাপে দেবরাজ তাঁর কাছ থেকে মোট ৫ লক্ষ ২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। শুধু নগদ অর্থই নয়, অত্যন্ত সুকৌশলে সে তরুণীর কাছ থেকে দু’টি সম্পূর্ণ নতুন এবং দামি মোবাইল ফোনও নিজের হস্তগত করে। অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভর করে তরুণী নিজের জমানো পুঁজি দিয়ে তাঁর হবু স্বামীকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে যাচ্ছিলেন।

    কিন্তু প্রবাদের কথায় আছে, ‘পাপ কখনও চিরকাল চাপা থাকে না’। এই ক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। হঠাৎ করেই তরুণীর সাজানো স্বপ্নের জগতে এক বিশাল ছন্দপতন ঘটে। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি জানতে পারেন দেবরাজের জীবনের এক অন্ধকার ও নোংরা দিক। যে যুবককে তিনি নিজের আগামী জীবনের নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, সে আসলে একজন পেশাদার নারী-প্রতারক। তরুণী খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, শুধু তিনি একা নন, তাঁর পাশাপাশি অন্তত আরও চার-পাঁচজন তরুণীর সঙ্গে একই ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট থেকে আলাপ জমিয়েছে দেবরাজ। তাদের সকলের সঙ্গেই সে নিয়মিত ডেটিং করছে এবং কাউকেই সে তার প্রতারণার জাল থেকে বাদ দেয়নি। অত্যন্ত আশ্চর্যের এবং ঘৃণার বিষয় হল, ওই সমস্ত তরুণীদেরও সে একইভাবে বিয়ের ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল। দেবরাজের এই কীর্তি সামনে আসতেই কার্যত মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে বরানগরের ওই তরুণীর। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন, ভালোবাসার এবং বিয়ের নামে তাঁর সঙ্গে দিনের পর দিন এক জঘন্য প্রতারণা করা হয়েছে।

    নিষ্ঠুর সত্য সামনে আসার পর তরুণী আর চুপ করে থাকতে পারেননি। তিনি সরাসরি দেবরাজের কাছে এই বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করেন। কেন সে এমন জঘন্য কাজ করল, অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে তার ঠিক কী সম্পর্ক এবং তাঁর কাছ থেকে নেওয়া টাকার কী হবে— সেই সব বিষয়ে তিনি কড়া জবাব চান। আর ঠিক এখানেই ঘটে যায় আরও এক নির্মম ও ভয়াবহ ঘটনা। নিজের আসল কীর্তি ফাঁস হয়ে গিয়েছে বুঝতে পেরে চরম হিংস্র ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে অভিযুক্ত দেবরাজ। নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার বদলে সে ওই তরুণীর ওপর পশুবৎ চড়াও হয়। শুরু হয় তীব্র বচসা, যা খুব দ্রুত পৌঁছায় মারাত্মক শারীরিক অত্যাচারে। অভিযোগ, তরুণীকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বেধড়ক মারধর করে ওই যুবক। এই পৈশাচিক হামলায় তরুণীর একটি হাত ভেঙে যায়। পুলিশের কাছে বয়ান দেওয়ার সময় তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর হাতে এখনও গভীর কাটার দাগ রয়েছে। এমনকি মুখের একাধিক জায়গাতেও মারধরের স্পষ্ট এবং দগদগে ক্ষতচিহ্ন বর্তমান।

    এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ওই তরুণীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। একদিকে বিপুল আর্থিক প্রতারণা, অন্যদিকে পাশবিক শারীরিক নির্যাতন— সব মিলিয়ে চরম দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। তরুণীর পরিবারে রয়েছেন তাঁর বয়স্ক ও অসুস্থ বাবা। মেয়ের এই ভয়ঙ্কর পরিণতি জানলে বৃদ্ধ বাবার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার চরম অবনতি হতে পারে, এই প্রবল আশঙ্কায় তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের কাউকেই কিছু জানাতে পারেননি। একাই নিজের সমস্ত কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি অসীম সাহস সঞ্চয় করেন এবং সমাজের এই ধরনের অপরাধীদের শাস্তি দিতে সরাসরি আইনের দ্বারস্থ হওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। শনিবার তিনি সটান চলে যান নারায়ণপুর থানায়। সেখানে গিয়ে অভিযুক্ত দেবরাজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ, ব্যাঙ্কের লেনদেনের নথি সহ একটি বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।

    এমন গুরুতর অভিযোগ পাওয়া মাত্রই নড়েচড়ে বসে নারায়ণপুর থানার পুলিশ প্রশাসন। বিষয়টির সংবেদনশীলতা, অপরাধের মাত্রা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করেনি তারা। তরুণীর বয়ান রেকর্ড করার পর পরই অভিযুক্তের খোঁজে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জোরদার তল্লাশি অভিযান শুরু হয়। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন এবং অন্যান্য সোর্সের মাধ্যমে পুলিশি তৎপরতায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্ত দেবরাজকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তদন্তকারী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, আর্থিক জালিয়াতি এবং শারীরিক নিগ্রহ সহ আইনের একাধিক সুনির্দিষ্ট জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করে জানার চেষ্টা চলছে, এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে সে একাই জড়িত, নাকি তার পিছনে অন্য কোনও বড় গ্যাং কাজ করছে। পাশাপাশি অন্যান্য যে তরুণীদের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে, তাদের বয়ানও রেকর্ড করার কথা ভাবছে পুলিশ।

    No Comments

    তাজা খবর