
নিউজ ডেস্ক; বয়স তাঁর প্রায় ৮০। কিন্তু সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখলে বয়স যেন শুধুই একটা সংখ্যা! গত জানুয়ারিতে স্ত্রী স্বর্ণলতাকে সাইকেল ভ্যানে বসিয়ে কৃষ্ণনগর থেকে কুম্ভমেলা ঘুরিয়ে এনেছিলেন নদিয়ার ‘বাঁকা’-দা। সেই অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই ফের সাইকেলে দীর্ঘ পথের যাত্রা শুরু করলেন তিনি। এ বার অবশ্য গন্তব্য কোনও তীর্থক্ষেত্র নয়, সরাসরি দিল্লি। আর এই যাত্রার পিছনে রয়েছে পরিবেশ রক্ষার দাবি।
কৃষ্ণনগরের বুক ঘেঁষে বয়ে চলা জলঙ্গি এবং অঞ্জনা নদীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বাঁকা। দীর্ঘদিন ধরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়া এই দুই নদীর পুনরুজ্জীবনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে সরাসরি দাবিপত্র জমা দিতে চান তিনি। সেই উদ্দেশ্যেই রবিবার সকালে কৃষ্ণনগর থেকে দিল্লির পথে সাইকেল নিয়ে রওনা হয়েছেন বাঁকা এবং তাঁর সঙ্গী উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়ার ৫৫ বছরের তারকচন্দ্র পাল।
দুই অভিযাত্রীর সামনে প্রায় ১৫০০ কিলোমিটারের পথ। কিন্তু সেই দূরত্ব নিয়েও বিশেষ চিন্তিত নন বাঁকা। তাঁর সহজ উত্তর, “ঠিক পৌঁছে যাব।” বয়সের ভারকে যেন পেছনে ফেলে ফের এক দীর্ঘ সাইকেলযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছেন তিনি।
রবিবার সকালে কৃষ্ণনগর পোস্ট অফিস মোড় থেকে দুই সাইকেল অভিযাত্রীকে বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিলেন নদী ও পরিবেশপ্রেমী বহু মানুষ। উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক তারকনাথ চট্টোপাধ্যায়, ‘সেভ জলঙ্গি’-র কর্ণধার যতন রায় চৌধুরী, নদিয়া বাইসাইকেল সোসাইটির অধিনায়ক সঞ্জয় রাহা-সহ আরও অনেকে। পরিবেশ রক্ষার বার্তা নিয়েই তাঁদের এই যাত্রা বলে উদ্যোক্তাদের তরফে জানানো হয়েছে।
বাঁকার আসল নাম দুলাল বিশ্বাস। তবে সরকারি নথিপত্রে থাকা সেই নামের তুলনায় নদিয়া তথা রাজ্যের পরিবেশপ্রেমীদের কাছে তিনি অনেক বেশি পরিচিত ‘বাঁকা’ বা ‘বাঁকাচাঁদ’ নামে। সাইকেল তাঁর কাছে নতুন কোনও বাহন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরেই সাইকেলকে সঙ্গী করে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো তাঁর অভ্যাস।
যৌবনে যেমন সাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন, তেমনই বয়স বাড়ার পরেও সেই অভ্যাসে ছেদ পড়েনি। মাঝবয়সে শ্বশুরবাড়ি হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় যাওয়ার সময় স্ত্রী স্বর্ণলতাকে সাইকেলে বসিয়েই প্যাডেল করতে করতে পৌঁছে যেতেন তিনি। শুধু তাই নয়, এক বার ভ্যান রিকশায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কামাখ্যাও গিয়েছিলেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাইকেল নিয়ে ঘোরার অভিজ্ঞতাও রয়েছে বাঁকার। কখনও একা, কখনও আবার কোনও বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একাধিক রাজ্য ঘুরেছেন। এখন বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই হলেও সাইকেলের প্রতি তাঁর টান একটুও কমেনি। বাড়িতে থাকলে প্রতি রবিবার এখনও নিয়ম করে কৃষ্ণনগর থেকে সাইকেল চালিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার ঘোরেন তিনি।
এ বার অবশ্য তাঁর সাইকেলযাত্রার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত নয়। কৃষ্ণনগরের দুই নদী—জলঙ্গি ও অঞ্জনার দুরবস্থা তুলে ধরতেই দিল্লির পথে যাত্রা। বাঁকার সঙ্গে রয়েছেন তারকচন্দ্র পাল। বয়সে বাঁকার তুলনায় অনেকটাই তরুণ হলেও দীর্ঘ সাইকেলযাত্রার ক্ষেত্রে তাঁরও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইতিমধ্যেই দু’বার সাইকেলে ভারত ভ্রমণ করেছেন তারক। ফলে ১৫০০ কিলোমিটারের এই অভিযানে দুই সাইকেলপ্রেমীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলেই মনে করছেন তাঁদের সহযোগীরা।
কেন এই দীর্ঘ যাত্রা? পরিবেশপ্রেমীদের বক্তব্য, জলঙ্গি ও অঞ্জনা নদীর বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জলধারণ ক্ষমতা এবং পরিবেশগত গুরুত্ব রক্ষার দাবি জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনেরই পরবর্তী ধাপ হিসেবে এ বার দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে দাবিপত্র জমা দেওয়ার উদ্যোগ।
‘সেভ জলঙ্গি’-র সম্পাদক শঙ্খশুভ চক্রবর্তীর দাবি, জলঙ্গি ও অঞ্জনা নদীকে পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানিয়ে সংগঠনের তরফে একাধিক বার প্রধানমন্ত্রীর দফতরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁর কথায়, নির্বাচনী সভায় প্রধানমন্ত্রী কৃষ্ণনগরে এসে জলঙ্গি ও অঞ্জনাকে কৃষ্ণনগরের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন এবং দুই নদীর সংস্কারের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটেই এ বার দুই অভিযাত্রীকে দিল্লিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত।
পরিবেশকর্মীদের পরিকল্পনা, বাঁকা ও তারক দিল্লিতে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে তাঁদের দাবিপত্র তুলে দেবেন। সংগঠনের তরফে পিএমও-তে ই-মেল করে দুই অভিযাত্রীর সেখানে পৌঁছে দাবিপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার আবেদন জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন শঙ্খশুভ।
এই অভিযানের পিছনে শুধু একটি নদী নয়, গোটা নদী-পরিবেশকে বাঁচানোর বার্তাও রয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। ‘সেভ জলঙ্গি’-র আর এক পদস্থ সদস্য শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ভাগীরথীর গুরুত্বপূর্ণ উপনদী জলঙ্গি এবং জলঙ্গির একটি শাখা নদী অঞ্জনা। এই দুই নদীকে বাঁচাতে তাঁদের সংগঠন প্রায় সাত বছর ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
জলঙ্গি-অঞ্জনার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগ নতুন নয়। নদীর সঙ্গে কৃষ্ণনগরের মানুষের সামাজিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তাই নদী বাঁচানোর দাবিকে শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে নয়, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও এলাকার পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছেন আন্দোলনকারীরা।
সেই দাবিকেই এ বার সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে দিল্লির দরবারে পৌঁছে দিতে চাইছেন ৮০ বছরের বাঁকা। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ৫৫ বছরের তারক। সামনে দীর্ঘ পথ, নানা প্রতিকূলতা, আবহাওয়ার ওঠানামা এবং প্রায় ১৫০০ কিলোমিটারের ক্লান্তিকর যাত্রা। তবু দুই সাইকেল অভিযাত্রীর লক্ষ্য একটাই—কৃষ্ণনগরের দুই মৃতপ্রায় নদীর কথা দেশের প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়া।
বাঁকার কাছে এই যাত্রা তাই শুধুই সাইকেল অভিযান নয়। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে ফের পথে নামা। আর এ বার তাঁর সাইকেলের গন্তব্য দিল্লি, সঙ্গে জলঙ্গি ও অঞ্জনাকে বাঁচানোর দাবি। কৃষ্ণনগর থেকে শুরু হওয়া এই সাইকেলযাত্রা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দফতরের দরজায় পৌঁছতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments