
নিউজ ডেস্ক; বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর প্রায় প্রতিটি উৎসবের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে আলোর রোশনাই। সেই আলোর কথা উঠলেই বাংলার মানচিত্রে যে শহরের নাম আলাদা করে মনে পড়ে, তা হল চন্দননগর। গঙ্গার তীরে ফরাসডাঙার এই শহরের আলোকশিল্পীরা বছরের পর বছর ধরে আলো সাজানোর ধরন, প্রযুক্তি এবং নকশায় একের পর এক নতুনত্ব এনে চলেছেন। দুর্গাপুজো হোক কিংবা জগদ্ধাত্রী পুজো, দেশের কোনও বড় অনুষ্ঠান থেকে বিদেশের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য—চন্দননগরের আলোর কারুকাজ বহু জায়গাতেই নজর কেড়েছে।
পুরনো দিনের টুনি বাল্ব থেকে শুরু করে ভিনাইল বোর্ড, তার পরে এলইডি—আলোকসজ্জার প্রযুক্তি যত বদলেছে, ততই নিজেদের কাজের ধরন বদলেছেন চন্দননগরের শিল্পীরা। এ বার দুর্গাপুজোর আগে সেই তালিকায় যোগ হয়েছে আরও একটি নতুন আকর্ষণ—রোপ লাইটের তৈরি বিশেষ নকশা এবং লোহার কাঠামোর আলোকসজ্জা। কলকাতা এবং আশপাশের জেলার একাধিক বারোয়ারি পুজোয় এ বার মণ্ডপসজ্জায় এই নতুন ধরনের আলো দেখা যেতে পারে।
পুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে চন্দননগরের ছোট-বড় সব আলোকশিল্পীর কর্মশালায়। কেউ কলকাতায় গিয়ে পুজোমণ্ডপে আলো লাগানোর কাজ করছেন, কেউ আবার শহরেই বসে নতুন নকশা তৈরি করছেন। শিল্পীদের দাবি, এ বারের বাজারে বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে সরু সরু কলকার মতো নকশা এবং আলপনার আদলে তৈরি রোপ লাইট। নানা রঙের আলোকে একসঙ্গে ব্যবহার করে এই নকশাগুলিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা চলছে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, রোপ লাইটের আর একটি সুবিধাও রয়েছে। অন্যান্য বেশ কিছু ধরনের আলোকসজ্জার তুলনায় এই আলো তুলনামূলক ভাবে হালকা এবং বিদ্যুৎ খরচও কম। ফলে পুজোর বাজেটের দিকে তাকিয়ে থাকা উদ্যোক্তাদের কাছেও এটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বড় বাজেটের পাশাপাশি সীমিত বাজেটের বারোয়ারি পুজো কমিটিগুলিও তাই এ বার রোপ লাইটের দিকে ঝুঁকছে বলে আলোকশিল্পীদের দাবি।
চন্দননগরের শিল্পীদের মতে, আলোর জগতে নতুন কোনও প্রযুক্তি এলেই সেটিকে সরাসরি ব্যবহার না করে তার সঙ্গে নকশা ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয় ঘটানোই তাঁদের বিশেষত্ব। টুনি বাল্বের ছোট ছোট আলোর বিন্যাস থেকে শুরু করে এলইডির ঝলকানি—প্রতিটি পর্যায়েই নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। এ বার সেই ধারাতেই রোপ লাইটকে ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে আলপনা, কলকা এবং নানা জ্যামিতিক নকশা।
আলোকশিল্পী কৌশিক চক্রবর্তীর কথায়, টুনি লাইটের সময় থেকে বর্তমানের এলইডি—আলোকসজ্জায় দীর্ঘ পরিবর্তনের সাক্ষী তাঁরা। তাঁর বক্তব্য, এলইডি আলো অনেক সময় সরাসরি চোখে তীব্র লাগত। তাই আলোর সামনে বিভিন্ন রঙের আবরণ ব্যবহার করে তার তীব্রতা কমিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজও করেছেন চন্দননগরের শিল্পীরা।
কৌশিকের দাবি, এ বারের দুর্গাপুজোয় তাঁদের অন্যতম বড় আকর্ষণ রোপ লাইটের নকশা। কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলোর মধ্যে নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম সেট করা হয়েছে। ফলে আলো শুধু স্থির ভাবে জ্বলবে না, নকশা অনুযায়ী তার পরিবর্তনও ঘটানো সম্ভব হবে। প্রযুক্তি এবং শিল্পের এই মেলবন্ধনই এ বারের আলোকসজ্জাকে অন্য মাত্রা দেবে বলে মনে করছেন শিল্পীরা।
পুজোর আগেই অবশ্য নতুন রোপ লাইটের পরীক্ষামূলক সাফল্য পেয়েছেন চন্দননগরের শিল্পীরা। শহরে আয়োজিত ইন্দো-ফরাসি যৌথ হেরিটেজ উৎসবে রোপ লাইট ব্যবহার করে একাধিক আলোকসজ্জার গেট তৈরি করেছিলেন আলোকশিল্পী সঞ্জয় ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ওই উৎসবে দর্শকদের মধ্যে রোপ লাইটের নকশা যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি করেছিল। তিন দিনের অনুষ্ঠানেই এর জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি তাঁর।
সঞ্জয়ের মতে, রোপ লাইটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এর ওজন কম এবং বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক ভাবে কম। বড় কাঠামোয় আলো বসানোর ক্ষেত্রে এই দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুজোর সময়ে একসঙ্গে বহু দিন ধরে আলো জ্বালাতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কোনও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে স্বাভাবিক ভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পায়।
এ বারের দুর্গাপুজোর বাজারের সঙ্গে অবশ্য অর্থনীতির বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। আলোকশিল্পীদের একাংশের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কলকাতার বারোয়ারি পুজোগুলির অনেক কমিটিতেই সাংগঠনিক পরিবর্তন এসেছে। অতীতে বিভিন্ন বড় পুজোর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ যোগ থাকার কথা তাঁরা উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে সেই পুরনো সমীকরণ বদলেছে বলেই তাঁদের দাবি। নতুন কমিটি তৈরি হওয়ায় পুজোর বাজেট নির্ধারণেও অনেক উদ্যোক্তা এ বার তুলনামূলক ভাবে সতর্ক।
ফলে চোখধাঁধানো আলোকসজ্জার পাশাপাশি খরচের হিসাবটিও এ বার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গাতেই রোপ লাইটের চাহিদা বাড়ছে বলে মনে করছেন চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা। কম ওজন, তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচ এবং কম জায়গায় আকর্ষণীয় নকশা তৈরি করার সুবিধা—সব মিলিয়ে এই আলো পুজোর বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে।
কলকাতার হিন্দুস্থান পার্কের পুজোয় এ বার আলোকসজ্জার দায়িত্ব পেয়েছেন প্রয়াত আলোকশিল্পী বাবু পালের স্ত্রী চিত্রলেখা পাল এবং তাঁর কন্যা সুশ্বেতা পাল। বাবু পালের মৃত্যুর পরে মা-মেয়েই আলোর ব্যবসার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তাঁদের পরিকল্পনাতেও এ বার রয়েছে নতুন ধরনের রোপ লাইট। লোহার কাঠামোর উপর হালকা আলোর সাহায্যে আলপনার নকশা ফুটিয়ে তোলা হবে। তাঁদের মতে, আলো খুব বেশি ঝলমলে না হয়ে নরম এবং মিষ্টি আবহ তৈরি করাই হবে এই নকশার বিশেষত্ব।
চিত্রলেখা ও সুশ্বেতার বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এলইডি এবং চিন থেকে আমদানি করা ক্রিস্টাল লাইটের ব্যবহার বেশি দেখা গিয়েছে। কিন্তু এ বার রোপ লাইটের মাধ্যমে তুলনামূলক ভাবে ভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জা তৈরি করার পরিকল্পনা হয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী আলপনার নকশাকে আধুনিক প্রযুক্তির আলোয় ফুটিয়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য।
দুর্গাপুজোর আগে তাই চন্দননগরে এখন শুধু আলো তৈরি হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে নতুন ভাবনা। শিল্প, প্রযুক্তি এবং বাজেট—তিনটির সমন্বয়ে এ বার কলকাতা ও জেলার পুজোমণ্ডপে কী ভাবে আলো সাজানো হবে, তার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। টুনি বাল্বের যুগ পেরিয়ে এলইডির ঝলকানি ইতিমধ্যেই চন্দননগরের আলোকশিল্পকে বিশ্বজোড়া পরিচিতি দিয়েছে। এ বার সেই পথেই নতুন সংযোজন রোপ লাইট।
পুজোর রাত নামলে লোহার কাঠামোর গায়ে আলপনার মতো ছড়িয়ে পড়বে রঙিন আলো। কোথাও কলকার নকশা, কোথাও জ্যামিতিক কারুকাজ। আর সেই আলোর পিছনে থাকবে চন্দননগরের শিল্পীদের পুরনো ঐতিহ্য এবং নতুন প্রযুক্তির মেলবন্ধন। ফলে এ বারের দুর্গাপুজোয় প্রতিমা ও মণ্ডপের পাশাপাশি আলোকসজ্জাতেও যে নতুন চমক অপেক্ষা করছে, তা বলাই যায়।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments