
নিউজ ডেস্ক; হুগলি নদীকে কেন্দ্র করে বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যকে এক সুতোয় বাঁধার পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। সপ্তগ্রাম, চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর এবং চন্দননগরকে ঘিরে তৈরি হতে চলেছে একটি বিশেষ ‘রিভার ট্যুরিজ়ম সার্কিট’। গঙ্গা-হুগলি জলপথ ব্যবহার করে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের এই ঐতিহাসিক শহরগুলিতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক দিকে যেমন নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে, অন্য দিকে বাংলার ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও স্থাপত্যকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা হবে।
শুক্রবার চন্দননগরে ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলের শতাব্দীপ্রাচীন রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কার কাজের সূচনা অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনার কথা জানান রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, বাংলার পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে শুধু পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলির উপর নির্ভর করলে চলবে না। ইতিহাস, নদী এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলার পুরনো যোগাযোগকে সামনে রেখে নতুন পর্যটনপথ তৈরি করা প্রয়োজন। সেই ভাবনারই অন্যতম অংশ হতে পারে হুগলি নদীকে ঘিরে এই ‘রিভার ট্যুরিজ়ম সার্কিট’।
হুগলি নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলগুলির ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এক সময় চন্দননগর ছিল ফরাসি উপনিবেশ। চুঁচুড়ায় ছিল ডাচদের প্রভাব, শ্রীরামপুরে ডেনিশদের উপস্থিতি এবং কাছেই ব্যান্ডেলে পর্তুগিজদের ঐতিহাসিক ছাপ রয়েছে। ফলে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে ইউরোপীয় স্থাপত্য, পুরনো গির্জা, প্রশাসনিক ভবন, সমাধিক্ষেত্র, প্রাচীন রাস্তা এবং নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা।
সরকারের পরিকল্পনা, এই ঐতিহাসিক সম্পদগুলিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে না দেখে একটি পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনা। নদীপথে পর্যটকরা এক শহর থেকে অন্য শহরে যাবেন, পাশাপাশি ঘুরে দেখবেন সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এতে পর্যটকদের সামনে একসঙ্গে বাংলার নদীভিত্তিক জীবন, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
চন্দননগরকে এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুক্রবারের অনুষ্ঠানে ভারতের সঙ্গে ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথাও উঠে আসে। ভারতে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথু জানান, শুধু পুরনো রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কারেই কাজ থেমে থাকবে না। ভবিষ্যতে চন্দননগরের ঐতিহ্যকে ঘিরে আরও নানা কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, পর্যটনকে কেন্দ্র করে ভারত ও ফ্রান্সের সম্পর্ক আরও মজবুত হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলায় ফরাসি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
চন্দননগর মহকুমাশাসকের দফতরের বিপরীতে অবস্থিত পুরনো রেজিস্ট্রি ভবনটি বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ভবনটি তৈরি হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। এক সময় এই ভবন থেকেই জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত রেজিস্ট্রেশনের কাজ পরিচালিত হত। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০১৭ সালে সেটিকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আগের সরকারের আমলেই ভবনটি সংস্কারের জন্য সমঝোতাপত্র বা ‘মউ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। এবার নতুন সরকারের আমলে অবশেষে সংস্কার প্রকল্পের কাজ শুরু হল। ফলে চন্দননগরের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের তালিকায় থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ ভবনটি নতুন করে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কার কাজের সূচনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার থেকেই চন্দননগরে শুরু হয়েছে তিন দিনের ইন্দো-ফ্রেঞ্চ হেরিটেজ উৎসব। শহরের ঐতিহাসিক স্ট্র্যান্ড রোড আলোয় সাজানো হয়েছে। অনুষ্ঠানের আবহে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চন্দননগরের ফরাসি অতীত এবং ভারত-ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক।
শুক্রবার বিকেল নাগাদ নদীপথে চন্দননগরে পৌঁছন ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথু। রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কার কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনার পর তিনি ফরাসি কবরস্থান, মিউজিয়াম-সহ শহরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখেন। অতিথিদের স্বাগত জানাতে রাস্তার দু’পাশে জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়ারা। উৎসব উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথু, রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার ও কলিতা মাঝি, চুঁচুড়ার প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়, চন্দননগরের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ, হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি-সহ প্রশাসনের আধিকারিকেরা।
অনুষ্ঠানে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠতেই ফুটবল নিয়েও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে। আগামী অক্টোবরে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের ভারতে এসে প্রীতি ম্যাচ খেলার সম্ভাবনার প্রসঙ্গ তুলে সাংবাদিকেরা জানতে চান, ভবিষ্যতে ফ্রান্সের জাতীয় দলকেও কি ভারতের মাটিতে একই ধরনের ম্যাচে দেখা যেতে পারে?
সরাসরি কিছু না বললেও ফরাসি রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে তৈরি হয়েছে জল্পনা। বাংলায় ফুটবলের জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আশাবাদী সুরে জানান, সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্যের পরেই বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে ফ্রান্সের জাতীয় দলের ভারত সফর নিয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা হয়নি।
অনুষ্ঠানে রসিকতার সুরে ফ্রান্সের ১৯০০ সালের অলিম্পিক ক্রিকেট প্রসঙ্গও তোলেন রাষ্ট্রদূত। তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই সময় ফ্রান্স অলিম্পিক ক্রিকেটের ফাইনালে উঠেছিল এবং ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায়। পরে অলিম্পিকে আর ক্রিকেট না হওয়ায় ফ্রান্সকে সেই প্রতিযোগিতার ‘শেষ রানার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
সব মিলিয়ে, পুরনো স্থাপত্যের সংস্কার, নদীপথে পর্যটন এবং ভারত-ফ্রান্স সাংস্কৃতিক সম্পর্ক—এই তিন দিককে একসঙ্গে সামনে রেখে চন্দননগরকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সপ্তগ্রাম থেকে চুঁচুড়া, চন্দননগর হয়ে শ্রীরামপুর—হুগলি নদীর দুই তীরের এই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডকে যদি পরিকল্পিত ভাবে একটি পর্যটন সার্কিটে পরিণত করা যায়, তা হলে বাংলার পর্যটন শিল্পে নতুন দরজা খুলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments