Homeজেলাসপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের দাবিতে দেশজুড়ে ব্যাঙ্ক ধর্মঘট, শান্তিপুরে বেসরকারি ব্যাঙ্কের ঝাঁপ ফেলার অভিযোগে তুঙ্গে বিতর্ক

সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের দাবিতে দেশজুড়ে ব্যাঙ্ক ধর্মঘট, শান্তিপুরে বেসরকারি ব্যাঙ্কের ঝাঁপ ফেলার অভিযোগে তুঙ্গে বিতর্ক

রানাঘাট : সময়সীমা অপরিবর্তিত রেখে সপ্তাহে পাঁচ দিন কর্মদিবসের দীর্ঘদিনের দাবি এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অবিলম্বে বেতন বৃদ্ধি সহ একাধিক বকেয়া ইস্যুকে সামনে রেখে দেশজুড়ে পালিত হল ব্যাঙ্ক কর্মীদের পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট।
resizeplus_Axis

রানাঘাট : সময়সীমা অপরিবর্তিত রেখে সপ্তাহে পাঁচ দিন কর্মদিবসের দীর্ঘদিনের দাবি এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অবিলম্বে বেতন বৃদ্ধি সহ একাধিক বকেয়া ইস্যুকে সামনে রেখে দেশজুড়ে পালিত হল ব্যাঙ্ক কর্মীদের পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট। ‘ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস’ বা ইউএফবিইউ (UFBU)-এর ডাকে আয়োজিত এই সর্বাত্মক ধর্মঘটের জেরে শুক্রবার সকাল থেকেই দেশের সমস্ত প্রান্তের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কিং পরিষেবা কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ব্যাঙ্কের ঝাঁপ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহল। একই সঙ্গে আন্দোলনকারী ইউনিয়ন নেতৃত্বের তরফ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, কেন্দ্র ও ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ যদি অবিলম্বে তাঁদের এই ন্যায্য দাবিগুলি মেনে না নেয়, তবে আগামী দিনে লাগাতার পাঁচ দিন পর্যন্ত ব্যাঙ্ক বন্ধ রেখে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন তাঁরা।

দেশজুড়ে চলা এই ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের আঁচ স্বভাবতই এসে পড়েছে নদিয়া জেলার রানাঘাট এবং শান্তিপুর মহকুমাতেও। তবে শান্তিপুরে এই ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক অনভিপ্রেত বিতর্ক এবং চরম উত্তেজনা। ধর্মঘট সর্বাত্মক করার লক্ষ্যে শান্তিপুরের একটি সুপরিচিত বেসরকারি ব্যাঙ্কের (অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক) শাখা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকাল থেকেই শান্তিপুরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়।

ব্যাঙ্ক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সকালে নির্দিষ্ট সময়েই ওই বেসরকারি ব্যাঙ্কের কর্মীরা তাঁদের শাখায় কাজে যোগ দিতে এসেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, কাজ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই) এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের একদল আন্দোলনকারী কর্মী আচমকা ওই বেসরকারি ব্যাঙ্কের শাখার সামনে এসে হাজির হন। ব্যাঙ্কের নিজস্ব কর্মী নন্দন মণ্ডল এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সংবাদমাধ্যমের সামনে ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি জানান, তাঁরা সম্পূর্ণ বেসরকারি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ধর্মঘটের আওতায় তাঁরা সরাসরি পড়েন না। তা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা দলবল নিয়ে এসে তাঁদের ব্যাঙ্কের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং কার্যত জোরজুলুম করে কর্মীদের বাইরে বের করে দেন। এরপর তাঁরা জোর করে ব্যাঙ্কের শাটার নামিয়ে দেন এবং শাটারে ও বাইরের দেওয়ালে ধর্মঘটের সমর্থনে একাধিক পোস্টার সেঁটে দেন। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে চরম অসহায়তার মধ্যে পড়েন বেসরকারি ব্যাঙ্কের কর্মীরা। কাজে যোগ দিতে এসেও বাধ্য হয়ে তাঁদের মাঝপথেই বাড়ি ফিরে যেতে হয়। নন্দনবাবু আরও জানান, গোটা বিষয়টি ইতিমধ্যেই ব্যাঙ্কের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, জোর করে বেসরকারি ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও নিজেদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে অনড় রয়েছেন ধর্মঘটিরা। শান্তিপুর এসবিআই শাখার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ইউএফবিইউ-এর অন্যতম স্থানীয় নেতা সুবীর দাস এই ধর্মঘটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ব্যাঙ্ক কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সপ্তাহে ৫ দিন কাজের দাবি জানিয়ে আসছেন, যা কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। তাঁর যুক্তি, বর্তমানে দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI), জীবন বিমা নিগম (LIC) থেকে শুরু করে সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরে সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের নিয়ম চালু রয়েছে। সেখানে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাঙ্ক কর্মীদের কেন এখনও সপ্তাহে ছয় দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হবে? সুবীরবাবু আরও দাবি করেন, এই ধর্মঘট সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে ডাকা হয়নি এবং এটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তও নয়। প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগেই ব্যাঙ্কের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং গ্রাহকদের এই ধর্মঘটের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করা হয়েছিল। বর্তমানে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে অনলাইন ব্যাঙ্কিং এবং এটিএম পরিষেবা ব্যাপকভাবে চালু থাকায় গ্রাহকদের খুব বড় কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার কথা নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে এর পাশাপাশি তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে, শুক্রবার বিকেলের মধ্যে কেন্দ্রীয় স্তরের বৈঠকে যদি কর্তৃপক্ষের তরফে কোনো সদর্থক সমাধান সূত্র বা ইতিবাচক আশ্বাস না মেলে, তবে আন্দোলনের ঝাঁঝ আরও বাড়ানো হবে। সে ক্ষেত্রে চলতি মাসের ২৮, ২৯ ও ৩০ তারিখ এবং তার সাথে শনি ও রবিবারের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে বলে তিনি জানান।

আন্দোলনকারীদের এই যুক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগের এক করুণ চিত্র। ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের দোহাই দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি যে কতটা কঠিন, তা শান্তিপুরের হবিবপুরের বাসিন্দা প্রায় ৭৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা কানন দেবনাথের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। তিনি শুক্রবার সকালে অনেক কষ্ট করে বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে ব্যাঙ্কে এসেছিলেন নিজের জমানো টাকা তুলতে। কিন্তু ব্যাঙ্কের দরজায় এসে দেখেন তালা ঝুলছে। অসহায় এই বৃদ্ধা জানান, ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের কোনো খবরই তাঁর কাছে ছিল না। স্মার্টফোন বা অনলাইন ব্যাঙ্কিং তো দূরের কথা, এটিএম কার্ড ব্যবহার করার মতো ধারণাও তাঁর নেই। ফলে এই বৃদ্ধ বয়সে এতটা পথ শারীরিক কষ্ট সহ্য করে এসেও টাকা তুলতে না পেরে চরম দুর্ভোগের শিকার হন তিনি। বাধ্য হয়ে খালি হাতেই রিকশা ধরে তাঁকে বাড়িতে ফিরে যেতে হয়। কানন দেবীর মতো আরও বহু সাধারণ গ্রাহক, পেনশনার এবং ছোট ব্যবসায়ীরা এদিন ব্যাঙ্কের সামনে এসে ফিরে গিয়েছেন। সার্বিকভাবে, একদিকে ব্যাঙ্ক কর্মীদের নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ের লড়াই, অন্যদিকে পাল্টা জোরজুলুমের অভিযোগ এবং সাধারণ গ্রাহকদের সীমাহীন ভোগান্তি—সব মিলিয়ে শুক্রবার শান্তিপুর সহ গোটা রাজ্যের ব্যাঙ্কিং মহলে এক তীব্র উত্তপ্ত ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আগামী দিনে এই জট কীভাবে কাটে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে সকলে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved