Last updated: September 11th, 2026 at 08:52 pm

শান্তিপুর:যেখানে ঝাঁ-চকচকে উদ্বোধন মানেই রকমারি আলোর রোশনাই, চোখধাঁধানো আয়োজন আর এলাহি খাওয়াদাওয়ার উৎসব, সেখানে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে নিঃশব্দে এক বিরল সামাজিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন নদিয়ার এক চিকিৎসক। আধুনিক চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের যুগে দাঁড়িয়ে পেশাকে শুধুই মুনাফা অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন, চিকিৎসা মূলত এক পবিত্র ব্রত। নদিয়ার শান্তিপুরের হরিপুর গ্রামের কৃতি সন্তান ডা. রতন হালদারের ব্যতিক্রমী পদক্ষেপে মুগ্ধ গোটা এলাকা। নিজের নবনির্মিত ওষুধ বিপণির সূচনা উপলক্ষে কোনও উৎসব নয়, বরং নিখরচায় বহুমূল্য লিভার ফাইব্রো স্ক্যান এবং জটিল রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ৭৫ জন সাধারণ মানুষের হাতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপহার তুলে দিলেন তিনি।
গত এক দশক ধরে শান্তিপুর এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার স্বাস্থ্য মানচিত্রে অত্যন্ত পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য এক নাম ডা. রতন হালদার। চিকিৎসার খরচ যখন প্রতিনিয়ত সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি নিয়ম করে মাত্র ১০০ টাকার প্রতীকী ফি নিয়ে প্রান্তিক মানুষদের চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে আসছেন। তবে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসাতেই তাঁর ভাবনা আটকে থাকেনি। অনেক দিন ধরেই তাঁর লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মানুষকে যেন প্রতিটি ছোটখাটো শারীরিক পরীক্ষার জন্য বাইরে ছুটতে না হয়। সেই ভাবনা থেকেই শান্তিপুরের কে সি দাস রোডে অবস্থিত নিজের বাসভবনেই এক ছাদের তলায় সর্বাঙ্গীন স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘MEDJIMI’ নামের এক সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। যেখানে স্বল্প ব্যয়ে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং ন্যায্যমূল্যে জীবনদায়ী ওষুধ সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সেই মহতী উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে শুক্রবার ডা. হালদারের বাসভবনে যাত্রা শুরু করল একটি ওষুধের দোকান। তবে অন্যান্য সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো কোনও ঢাকঢোল পিটিয়ে ফিতে কেটে বা মিষ্টিমুখ করিয়ে এই বিপণির সূচনা হয়নি। মানবিক চিকিৎসক ও তাঁর পরিবার এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজন করেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এক আধুনিক স্বাস্থ্য শিবিরের। শান্তিপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রথম ৭৫ জন রোগীকে এ দিন বাছাই করা একাধিক জরুরি স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিষেবা দেওয়া হয়, যার বাণিজ্যিক মূল্য হাজার হাজার টাকা।
এই শিবিরে ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের আগাম ঝুঁকি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘HbA1c’ এবং ‘লিপিড প্রোফাইল’ রক্ত পরীক্ষা সম্পূর্ণ নিখরচায় করিয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লিভারের জটিল অসুখ নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও আধুনিক ‘লিভার ফাইব্রো স্ক্যান’ পরিষেবাও রোগীদের দেওয়া হয়েছে নিখরচায়। শান্তিপুরের স্থানীয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এই ধরনের উন্নত পরীক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, ফলে সাধারণত স্থানীয় বাসিন্দাদের রানাঘাট, কল্যাণী কিংবা কলকাতায় গিয়ে মোটা টাকা খরচ করে এই পরীক্ষা করাতে হতো। ঘরের দোরগোড়ায় এমন দামি পরীক্ষা বিনামূল্যে করাতে পেরে যারপরনাই উপকৃত হয়েছেন বহু দুঃস্থ রোগী। পরীক্ষার পাশাপাশি অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগীদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্রও দেন।
চিকিৎসক হালদারের এই মহতী চিন্তাভাবনাকে পূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছেন তাঁর স্ত্রী প্রিয়ঙ্কা হালদার। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার তদারকি করতে গিয়ে তিনি জানান, ওষুধের দোকান বা কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলার অর্থ কেবল কৃত্রিম জাঁকজমক দেখানো নয়। যে প্রতিষ্ঠান মানুষের শরীর সারানোর দায়িত্ব নিচ্ছে, তার সূচনা মানুষের নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি স্পষ্ট করেন, মিষ্টি খাইয়ে আত্মপ্রচার করার চেয়ে সেই খরচে যদি অন্তত কয়েক জন অসুস্থ মানুষের প্রাণ বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া যায়, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে এই চত্বরে যাতে স্থানীয় মানুষ ন্যূনতম ব্যয়ে উন্নত সব ক্লিনিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করাই তাঁদের পরিবারের মূল সংকল্প।
স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকের এই নজিরবিহীন মানবিক ভূমিকায় আবেগাপ্লুত শান্তিপুরবাসী। শিবিরে আসা প্রবীণ থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা একবাক্যে স্বীকার করছেন, ব্যয়বহুল আধুনিক চিকিৎসায় যখন পকেটে টান পড়ে নাভিশ্বাস ওঠে, তখন ঘরের ছেলে হিসেবে ডাক্তারবাবুর এমন নিঃস্বার্থ উদ্যোগ যেন তাঁদের কাছে বিরাট স্বস্তি ও ভরসার জায়গা। শান্তিপুরের গণ্ডি ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী রানাঘাট মহকুমা জুড়েও এখন ডা. হালদারের এই সচেতন সমাজসেবা ব্যাপক প্রশংসা কুড়োচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments