Last updated: September 11th, 2026 at 08:25 pm

বিশ্ব ব্যানার্জী:উন্নয়নের রথ যখন তীব্র গতিতে ছুটে চলে, তখন তার চাকায় পিষ্ট হয়ে যায় প্রান্তিক বহু মানুষের রুটিরুজি। রেলের সম্প্রসারণ বা প্ল্যাটফর্মের সৌন্দর্যায়নের মতো উন্নয়নমূলক কাজ নিঃসন্দেহে সাধু উদ্যোগ। কিন্তু এর জেরে যখন বিনা নোটিশে বা পর্যাপ্ত পুনর্বাসন ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তখন বহু গরিব হকারের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ঠিক এমনই এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল নদিয়ার শান্তিপুরের ঢাকাপাড়ার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ রক্ষিতের পরিবার। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা চায়ের দোকানটি চোখের পলকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল রেলের বুলডোজার। রাতারাতি উপার্জনহীন হয়ে অথৈ জলে পড়েছিল গোটা পরিবার। সংসারের অন্ন সংস্থানের পাশাপাশি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল মেধাবী মেয়ের শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সমাজের বুকে আজও যে মানবিকতা বেঁচে রয়েছে, তার এক অনন্য নজির স্থাপন করল শান্তিপুর কলেজ কর্তৃপক্ষ। চরম দুর্দিনে উচ্ছেদ হওয়া ওই অসহায় চা-বিক্রেতার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজের নিজস্ব ক্যাম্পাসে একটি অস্থায়ী চায়ের দোকান চালানোর অনুমতি দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই একটি পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করলেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ঢাকাপাড়ার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ রক্ষিত কোনও নতুন ব্যবসায়ী নন। বিগত ২৩ বছর ধরে তিনি শান্তিপুর রেলওয়ে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান চালিয়ে আসছিলেন। এই চায়ের দোকানটিই ছিল তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। পরিবার বলতে বিশ্বজিৎবাবুর বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, পঞ্চম শ্রেণিতে পাঠরত ছোট ছেলে এবং বড় মেয়ে শ্রীপর্ণা। শ্রীপর্ণা বর্তমানে বাংলা বিষয়ে অনার্স নিয়ে স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই সে অত্যন্ত মেধাবী। তার স্বপ্ন, পড়াশোনা শেষ করে সে একজন আদর্শ শিক্ষিকা হিসেবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। বাবা বিশ্বজিৎবাবুও শত অভাবের মধ্যেও মেয়ের এই স্বপ্ন পূরণে কোনও খামতি রাখেননি। কাকভোরে উঠে স্টেশনে চা বিক্রি করে যা উপার্জন হত, তা দিয়েই সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে আসছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি রেলওয়ের তরফ থেকে স্টেশন চত্বরে উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর সেই কাজের অঙ্গ হিসেবেই প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্যান্য হকারদের পাশাপাশি বিশ্বজিৎবাবুর দীর্ঘ ২৩ বছরের পুরনো দোকানটিও উচ্ছেদ করা হয়।
দোকানটি ভেঙে দেওয়ার পর কার্যত আকাশ ভেঙে পড়ে বিশ্বজিৎবাবুর মাথায়। হঠাৎ করে আয়ের একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাতে শুরু করে পরিবারটি। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ, সংসারের নিত্যদিনের খরচ এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ছোট ছেলের স্কুলের খরচ কোনওরকমে টেনেটুনে চালালেও, বড় মেয়ে শ্রীপর্ণার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছিলেন বিশ্বজিৎবাবু। একটি মেয়ের শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন দারিদ্র্যের কশাঘাতে যখন প্রায় অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে চলেছিল, তখন পুনর্বাসনের আশায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু সব জায়গা থেকেই মিলেছে শুধুই হতাশা আর শূন্য প্রতিশ্রুতি।
ঠিক সেই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির জীবনে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হন শান্তিপুর কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ড. সঞ্জীব কুমার পাকিরা। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বিশ্বজিৎবাবুর দোকানে মাঝেমধ্যেই চা খেতে যেতেন অধ্যক্ষ মহাশয়। সেই সূত্রেই দুজনের মধ্যে একটা পূর্বপরিচিতি ছিল। বিশ্বজিৎবাবু একদিন সুযোগ পেয়ে অধ্যক্ষকে তাঁর এই অসহায় পরিস্থিতির কথা সবিস্তারে জানান। মানুষের বিপদে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেননি শিক্ষাবিদ ড. সঞ্জীব কুমার পাকিরা। তাঁর মনে দাগ কাটে বিশ্বজিৎবাবুর পরিবারের দুর্দশার কথা। বিশেষ করে একজন মেধাবী কলেজ ছাত্রীর পড়াশোনা অর্থাভাবে মাঝপথে থমকে যাবে, এটা তিনি একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। মানবিকতার খাতিরেই তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেন।
শান্তিপুর কলেজে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা ছিল স্থায়ী ক্যান্টিনের অভাব। কলেজে কোনও ক্যান্টিন না থাকায় অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মী থেকে শুরু করে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে সামান্য চা-টিফিন বা পানীয় জলের জন্য ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হত। এতে যেমন সবার মূল্যবান সময় নষ্ট হত, তেমনই অভিভাবকদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হত। এই দুটি বিষয়কে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি চমৎকার সমাধানের পথ বের করেন অধ্যক্ষ। কলেজের অন্যান্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং পরিচালন সমিতির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, কলেজ চত্বরেই বিশ্বজিৎবাবুকে একটি ছোট অস্থায়ী চায়ের দোকান করার অনুমতি দেওয়া হবে। এর ফলে কলেজের দীর্ঘদিনের চা-টিফিনের চাহিদাও মিটবে, আর একটি অসহায় পরিবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
কলেজ কর্তৃপক্ষের এই যুগান্তকারী ও মানবিক সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই খুশির হাওয়া রক্ষিত পরিবারে। চরম হতাশা কাটিয়ে নতুন করে বাঁচার রসদ পেয়েছেন বিশ্বজিৎবাবু। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, শান্তিপুর কলেজের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করছেন। তিনি বলেন, “পেটের দায়ে রোজগারের পথ তো একটা জুটলই, তবে তার চেয়েও বড় শান্তি হল আমার মেয়েটার পড়াশোনা আর বন্ধ হল না। ও যে শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, কলেজের অধ্যক্ষ এবং সবার আশীর্বাদে তা হয়তো এবার সত্যি হতে চলেছে।” অন্যদিকে, কলেজের অধ্যক্ষ ড. সঞ্জীব কুমার পাকিরা তাঁর এই পদক্ষেপ প্রসঙ্গে বলেন, “ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে চা খেতে গিয়ে কর্মীদের সময় নষ্ট হত। সেই বাস্তব প্রয়োজন থেকেই আপাতত এই অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি পরিবারকে সাহায্য করতে পেরে আমরাও খুশি।” তবে তিনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা। পরবর্তীকালে সরকারি সমস্ত নিয়মকানুন ও নির্দেশিকা মেনেই কলেজে স্থায়ী ক্যান্টিন নির্মাণের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। আপাতত বিশ্বজিৎবাবুর চায়ের দোকানের মিষ্টি গন্ধে শান্তিপুর কলেজের বাতাসে মিশেছে এক হার না মানা জীবনসংগ্রাম ও মানবিকতার জয়গান।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments