
নিউজ ডেস্ক; টোটো নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন প্রতিদিনের মতোই। রাতেও স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। জানিয়েছিলেন, যাত্রী নিয়ে ভাড়ায় রয়েছেন। কিন্তু তার পর থেকেই আর কোনও খোঁজ মেলেনি। ফোন বেজে গেলেও ধরেননি। রাতভর খোঁজ করেও সন্ধান পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সকালে টাকি রোডের ধারে একটি ডোবা থেকে উদ্ধার হল টোটোচালকের রক্তাক্ত দেহ। ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শাসন থানার গোলাবাড়ি এলাকায়।
মৃতের নাম সঞ্জিত দাস (৩২)। বারাসতের যশোহর রোডের ১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন জগদিঘাটা কাজিপাড়ায় তাঁর বাড়ি। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, স্ত্রী এবং এক মেয়েকে নিয়ে সংসার ছিল সঞ্জিতের। বুধবার দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে টোটো নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। প্রতিদিনের মতোই যাত্রী নিয়ে বেরিয়েছিলেন বলে পরিবারের দাবি। কিন্তু সেই রাত আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর।
পরিবারের অভিযোগ, সঞ্জিতের দেহের একাধিক জায়গায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাত ও পায়েও আঘাতের দাগ মিলেছে। সবচেয়ে গুরুতর চিহ্ন দেখা গিয়েছে গলার কাছে। প্রাথমিক ভাবে পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মীদের ধারণা, তাঁকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও ঠিক কী কারণে এই ঘটনা এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, অন্য দিন টোটো চালিয়ে বাড়ি ফিরতে সঞ্জিতের রাত প্রায় ১২টা বেজে যেত। ফলে বুধবার রাতেও প্রথম দিকে তাঁর বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় বিশেষ সন্দেহ হয়নি। রাত ১০টা নাগাদ স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তাঁর। সেই সময় সঞ্জিত জানিয়েছিলেন, তিনি ভাড়ায় রয়েছেন। অর্থাৎ তখনও স্বাভাবিক ভাবেই কাজ করছিলেন তিনি।
কিন্তু রাত ১১টার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সঞ্জিতের মোবাইলে ফোন করলে ফোন বেজে যায়, কিন্তু তিনি আর তা ধরেননি। বার বার ফোন করেও সাড়া না মেলায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সঞ্জিতের সহকর্মী টোটোচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পরিবারের লোকজন।
সহকর্মীরা রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালান। যে সব এলাকায় সঞ্জিত সাধারণত টোটো চালাতেন, সেখানেও তাঁর সন্ধান করা হয়। কিন্তু রাতভর তল্লাশি চালিয়েও তাঁর কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। অন্য দিকে, সঞ্জিতের মোবাইল ফোনটি তখনও সক্রিয় ছিল বলে জানা যায়। বৃহস্পতিবার সকালেও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন বেজে যাওয়ায় পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়ে। এরপর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
পুলিশের সাহায্যে মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন খতিয়ে দেখা শুরু হয়। সেই সূত্র ধরেই সঞ্জিতের দুই সহকর্মী টাকি রোডের ধারে শাসন থানার গোলাবাড়ি এলাকার একটি পেট্রল পাম্পের কাছে পৌঁছন। সেখানে তাঁরা সঞ্জিতের টোটোটি দেখতে পান। কিন্তু টোটোর হ্যান্ডেলে রক্তের দাগ নজরে আসতেই তাঁদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
এর পর আশপাশের এলাকায় তল্লাশি শুরু করেন তাঁরা। টোটোটি যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, তার কাছাকাছি টাকি রোডের ধারে একটি ডোবার মধ্যে নজর পড়ে। সেখানেই পাওয়া যায় সঞ্জিতের দেহ। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। শাসন থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহটি উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদেহের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাত ও পায়ে আঘাতের দাগ ছাড়াও গলার কাছে গুরুতর ক্ষত পাওয়া গিয়েছে। গলার নলি ফুটো করার মতো চিহ্নও রয়েছে বলে পরিবার সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই আরও স্পষ্ট হবে।
সঞ্জিত সক্রিয় ভাবে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলেই পরিবারের দাবি। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি বারাসত মণ্ডলের বিজেপির শক্তিপ্রমুখ আমিরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই রাজনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও এলাকায় প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এখনও পর্যন্ত এমন কোনও যোগসূত্রের প্রমাণ সামনে আসেনি। পুলিশও তদন্তের কোনও সম্ভাব্য দিক উড়িয়ে দিচ্ছে না।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই খুনের মামলা রুজু করেছে শাসন থানার পুলিশ। সঞ্জিত শেষ বার কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন, তাঁর টোটোয় কারা উঠেছিলেন এবং কেন টোটোটি পেট্রল পাম্পের কাছে পড়ে রইল—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং টাওয়ার লোকেশনও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
একই সঙ্গে টোটোর হ্যান্ডেলে রক্তের দাগ কী ভাবে এল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকা থেকে কোনও প্রমাণ বা সূত্র পাওয়া গিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। দেহ যেখানে পাওয়া গিয়েছে এবং টোটো যেখানে উদ্ধার হয়েছে—এই দুই জায়গার মধ্যে দূরত্ব ও সম্ভাব্য যোগাযোগের পথও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সঞ্জিতের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে রেখে তাঁর এই পরিণতি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন সাধারণ টোটোচালক কী ভাবে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়লেন, কেন রাতের অন্ধকারে তাঁর দেহ ডোবায় ফেলে রাখা হল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
এই ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীরা বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোচ্ছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, মোবাইলের তথ্য এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া সম্ভাব্য প্রমাণ মিলিয়ে দেখার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার নেপথ্যের রহস্য আরও পরিষ্কার হতে পারে। আপাতত খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে শাসন থানার পুলিশ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments