Last updated: August 26th, 2026 at 05:45 pm

নিউজ ডেস্ক: কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির সরু গলিগুলোতে এখনও বাতাসে ভেসে বেড়ায় কাঁচা মাটির সোঁদা গন্ধ। আর সেই পুণ্য মাটিতেই যুগের পর যুগ ধরে রূপ পেয়ে চলেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের অজস্র ইতিহাস ও আনকোরা গল্প। জলঙ্গি নদীর তীরের সেই উর্বর মাটি ও শিল্প সুষমাই এবার ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে দূর জাপানের মাটিতে পৌঁছতে চলেছে। আর এই অভূতপূর্ব গৌরবময় যাত্রার রূপকার কৃষ্ণনগরের ষষ্ঠীতলা কুমোরপাড়ার ২৩ বছরের প্রতিশ্রুতিমান তরুণ মৃৎশিল্পী অগ্নিভ পাল। তাঁর তুলির অনবদ্য টান ও নিপুণ হাতের জাদুতে গড়া দুর্গা প্রতিমা এ বছর পূজিত হতে চলেছে জাপানের দূর দেশে।
অগ্নিভের সঙ্গে মাটির এই সখ্য বা আত্মিক সম্পর্ক অবশ্য একদিনের নয়। শৈশবে বাবার কর্মশালায় খেলাধুলার ছলেই মাটির তাল চেনার সেই প্রথম সূচনা। বয়স যখন মাত্র ১২ বা ১৩ বছর, তখনই হাত ধরে প্রতিমা গড়ার পাঠ নেওয়া শুরু। খেলাচ্ছলে শুরু হওয়া সেই মাটির সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়। কৃষ্ণনগর ডিএল কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের এই মেধাবী ছাত্র পড়াশোনা সামলেই তিল তিল করে গড়ে তুলছেন তাঁর শিল্পসত্তাকে। শিল্পভাবনাকে পেশাদার রূপ দিতে বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী সুবীর পালের অধীনে নিবিড় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। মাটির নিষ্প্রাণ কাঠামোকে কীভাবে প্রাণবন্ত করে তুলতে হয়, কীভাবে প্রতিমার চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলতে হয় আধ্যাত্মিক ও পরম অভিব্যক্তি— প্রতিদিন তা শিখছেন এই তরুণ।
জাপানে পাড়ি দেওয়া এই বিশেষ প্রতিমাটির উচ্চতা প্রায় ৪ ফুট ২ ইঞ্চি এবং চওড়ায় সাড় সাড়ে ৪ ফুট। দীর্ঘ ভ্রমণের ঝক্কি ও স্থায়িত্বের কথা মাথায় রেখে প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ সতর্কতা। টানা প্রায় তিন মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে রূপ পেয়েছে এই উমা রূপ। প্রথমে কাদা মাটি দিয়ে সুসংগঠিত মূল কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর তার ওপর প্লাস্টার অব প্যারিসের (POP) সূক্ষ্ম ছাঁচ ঢালা হয়। সর্বশেষে আধুনিক ফাইবারগ্লাসের প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিমাটিকে দেওয়া হয়েছে মজবুত এবং চূড়ান্ত রূপ। এত দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে এটি যেমন হালকা, তেমনই অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী। ফাইবার কাঠামোর ওপর সূক্ষ্ম রঙের কাজ এবং ভক্তিভরে ‘চক্ষুদান’— সমস্তটাই নিজে হাতে নিখুঁতভাবে শেষ করেছেন অগ্নিভ।
জাপানের মাটিতে অগ্নিভের প্রতিমা পূজিত হওয়ার ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। তিন বছর আগে তাঁর হাতে তৈরি একটি আড়াই ফুটের ফাইবারগ্লাসের ছোট দুর্গা প্রতিমা প্রথম পাড়ি দিয়েছিল জাপানে। সেখানে এক প্রবাসী ভারতীয় পরিবারের সঙ্গে তাঁর শিল্পের পরিচয় ঘটে। সেই কাজের অনন্য গুণমান ও নান্দনিকতায় মুগ্ধ হয়েই ওই প্রবাসী পরিবার এবার অগ্নিভকে বড় আকারের এই প্রতিমা গড়ার বরাত দেন। আগের চেয়ে আয়তনে বড় হওয়ায় দায়িত্বের ভারও ছিল অনেক বেশি, যা সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন তিনি।
অগ্নিভের এই কৃতিত্ব এমন এক সময়ে এল, যখন ঐতিহাসিক কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী মাটি ও মৃৎশিল্প আনুষ্ঠানিকভাবে ভৌগোলিক সূচক বা জিআই (GI) স্বীকৃতি লাভ করেছে। ফলে ঘূর্ণি ও সংলগ্ন অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের ঘরে ঘরে এখন নতুন উদ্দীপনা ও উদযাপনের আবহ। বহু বছরের প্রাচীন এই লোকশিল্প এবার বিশ্বমঞ্চে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পাওয়ায় আনন্দিত জেলার শিল্পী সমাজ। সেই আনন্দের আবহেই অগ্নিভের তৈরি দুর্গার জাপানযাত্রা যেন ঘূর্ণির অহংকারকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে কেবল সাময়িক এই সাফল্যে থেমে থাকতে চান না অগ্নিভ। পড়াশোনা শেষ করে মৃৎশিল্পকেই নিজের মূল পেশা এবং সাধনা হিসেবে বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বাবার কাছ থেকে শেখা এই শিল্পকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরাই এখন তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। এক তাল মাটি আর জলঙ্গির সোঁদা গন্ধ থেকে শুরু হওয়া একটি বালকের যাত্রা আজ আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত। অগ্নিভ পালের এই সাফল্য কেবল একজন তরুণ শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়— এ গল্প কৃষ্ণনগরের মাটির রূপকথার, বাংলার হাজার বছরের শিল্প-ঐতিহ্যের জয়যাত্রার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments