
নিউজ ডেস্ক; কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো খাবার জোটেনি। মাথার উপর ছিল না ছাদ। উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যে বাড়িতে ভাড়ায় থাকতেন, সেখান থেকেও বেরিয়ে যেতে হয়েছিল বলে দাবি। শেষ পর্যন্ত লোটা-কম্বল নিয়ে রাস্তার ধারে প্লাস্টিক বিছিয়ে দিন কাটছিল বৃদ্ধা মা এবং তাঁর মেয়ের। খোলা আকাশের নীচে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা সেই মা-মেয়ের পাশে দাঁড়ালেন এক পুলিশকর্মী। তাঁর উদ্যোগেই শেষ পর্যন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেন তাঁরা। চুঁচুড়ায় এই ঘটনাই সামনে আনল পুলিশের এক মানবিক মুখ।
চুঁচুড়ার বিবেকানন্দ রোডের পাশে বেশ কিছু দিন ধরে অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন বছর পঁচাশি বয়সি মেঘা দাস এবং তাঁর ৪৫ বছরের মেয়ে অর্চনা দাস। স্থানীয়দের চোখে পড়লেও পরিস্থিতি কী ভাবে বদলাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। মা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। মেয়েরও শারীরিক সমস্যা রয়েছে। ফলে দু’জনের কাছেই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার পথ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছিল।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, অর্চনা কিছু দিন আগেও বিভিন্ন বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন। সেই কাজ থেকেই কোনও রকমে সংসার চলত। কিন্তু শারীরিক অসুবিধার কারণে এখন আর নিয়মিত কাজ করতে পারেন না তিনি। ফলে আয় বন্ধ হয়ে যায়। অন্য দিকে, ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় যে বাড়িতে মা-মেয়ে থাকতেন, সেখান থেকেও তাঁদের চলে যেতে হয়েছিল বলে দাবি অর্চনার।
এর পরেই তাঁদের ঠিকানা হয়ে ওঠে রাস্তার ধারে একটি জায়গা। সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু জিনিসপত্র। প্লাস্টিক বিছিয়ে কোনও রকমে রাত কাটাচ্ছিলেন তাঁরা। কখনও খাবার জুটেছে, কখনও জোটেনি। বয়সের ভারে দুর্বল মায়ের সঙ্গে অসুস্থ মেয়ের এই অবস্থার কথা শেষ পর্যন্ত পৌঁছয় পুলিশের এক কর্মীর কাছে।
চন্দননগর পুলিশের কনস্টেবল সুকুমার উপাধ্যায়ের কাছে বিষয়টি পৌঁছে দেন তাঁর এক সহকর্মী। খবর পাওয়ার পর আর দেরি করেননি সুকুমার। নিজেই ওই জায়গায় গিয়ে মা-মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পর দু’জনকেই সেখান থেকে উদ্ধার করার উদ্যোগ নেন তিনি।
এর পর মা-মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয় ইমামবাড়া হাসপাতালের লাগোয়া ‘নবজীবন’ সেন্টারে। সেখানেই তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্তত আপাতত মাথার উপর ছাদ পেয়েছেন মেঘা এবং অর্চনা। রাস্তার ধারে প্লাস্টিকের নীচে রাত কাটানোর দিন শেষ হয়েছে তাঁদের।
অর্চনার কথায়, জীবনের কঠিন পরিস্থিতিই তাঁদের রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, একটা সময় বাড়িতে ছিলেন, কাজও করতেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ার পরে কাজ করা সম্ভব হয়নি। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িভাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ি ছাড়তে হয় তাঁদের।
অসহায় অবস্থায় রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর পুলিশের কাছ থেকে এই সাহায্য পেয়ে কৃতজ্ঞ মা-মেয়ে। তাঁদের বক্তব্য, কঠিন সময়ে কেউ পাশে দাঁড়াবেন, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি। কনস্টেবল সুকুমারের উদ্যোগেই আপাতত তাঁদের নিরাপদ আশ্রয় মিলেছে।
সুকুমার জানিয়েছেন, এক সহকর্মী ফোন করে তাঁকে ওই মা-মেয়ের পরিস্থিতির কথা জানান। খবর পেয়েই তিনি সেখানে যান। এরপর তাঁদের উদ্ধার করে ‘নবজীবন’ সেন্টারে নিয়ে আসেন। মা-মেয়ের পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, এক সময় তাঁদের বাড়িঘর এবং আত্মীয়স্বজন—সবই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত পরিসর কার্যত হারিয়ে গিয়েছে।
এই ঘটনা শুধু দু’জন অসহায় মানুষের আশ্রয় পাওয়ার কাহিনি নয়, বরং সমাজে প্রান্তিক হয়ে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এনে দিয়েছে। বয়সের ভারে বৃদ্ধ মা এবং শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকা মেয়ের মতো মানুষের জন্য একটি ছোট সহায়তাও অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশের কাজ সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কোনও পুলিশকর্মী যখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন ঘটনাটি আলাদা করে নজর কাড়ে। সুকুমারের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে। সহকর্মীর কাছ থেকে খবর পাওয়ার পরে বিষয়টিকে শুধুমাত্র একটি অভিযোগ বা খবর হিসেবে না দেখে তিনি নিজে ঘটনাস্থলে পৌঁছন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেন।
চুঁচুড়ার বিবেকানন্দ রোডের পাশে যে মা-মেয়ে এক সময় আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তাঁদের জীবনে আপাতত নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। ‘নবজীবন’ সেন্টারে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা হওয়ায় অন্তত রাত কাটানোর জন্য আর রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। সামনে তাঁদের জীবন কী ভাবে আরও স্থায়ী ভাবে গুছিয়ে দেওয়া যায়, সেই প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যাচ্ছে।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় স্বস্তি, ৮৫ বছরের বৃদ্ধা মেঘা দাস এবং তাঁর মেয়ে অর্চনা দাস আর খোলা আকাশের নীচে পড়ে নেই। এক পুলিশকর্মীর উদ্যোগ তাঁদের জীবনে অন্তত সাময়িক নিরাপত্তার ছাদ এনে দিয়েছে। কঠিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ছোট্ট উদ্যোগই চুঁচুড়ায় হয়ে রইল মানবিকতার এক বড় নজির।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments