Last updated: September 4th, 2026 at 02:26 pm

নিউজ ডেস্ক; চুঁচুড়ার ময়ূরপঙ্ক্ষী ঘাট সংলগ্ন একটি রেস্তোরাঁয় যৌথ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যসামগ্রী উদ্ধার করল জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর, খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের আধিকারিকেরা একসঙ্গে ওই রেস্তোরাঁয় হানা দেন। অভিযানে উদ্ধার হয় মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া ঠান্ডা পানীয়, চিজ, শিশুদের খাবার এবং বাসি ও পচা মাংস। পাশাপাশি এমন ঘিও পাওয়া যায়, যার প্যাকেটে ব্যাচ নম্বর বা মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখের কোনও উল্লেখ ছিল না।
গঙ্গার ধারে জনপ্রিয় ওই রেস্তোরাঁয় অভিযান চালাতে গিয়ে রান্নাঘরের পরিবেশ দেখে কার্যত হতবাক হয়ে যান প্রশাসনের আধিকারিকেরা। অভিযোগ, রান্নাঘরে খাবার সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম নিয়মও মানা হচ্ছিল না। খাবার তৈরির জায়গা থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী রাখার পদ্ধতি—সব কিছুতেই চরম অব্যবস্থার ছবি সামনে আসে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই দ্রুত সমস্ত বিপজ্জনক খাদ্যসামগ্রী নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক মৃগাঙ্গমৌলি কর, অতিরিক্ত স্বাস্থ্য আধিকারিক (২) দেবযানী বসু মল্লিক, অতিরিক্ত জেলাশাসক অর্ঘ্য ঘোষ-সহ জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের অন্যান্য আধিকারিকেরা। খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের কর্মীরাও অভিযানে অংশ নেন। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গঙ্গাতীরের ওই রেস্তোরাঁয় খাবারের গুণমান ও রান্নাঘরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরেই এই যৌথ অভিযান চালানো হয়।
অভিযানকারীরা রেস্তোরাঁয় ঢুকে প্রথমেই খাদ্যসামগ্রীর মজুত পরীক্ষা করেন। সেখানে বেশ কিছু প্যাকেটজাত খাবারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেগুলি ব্যবহার বা বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল ঠান্ডা পানীয়, চিজ এবং শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট খাবার। শিশুদের খাবার মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মজুত করে রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, শিশুদের খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ প্যাকেটজাত খাবারই নয়, রেস্তোরাঁ থেকে উদ্ধার হয়েছে বাসি এবং পচা মাংসও। প্রশাসনের দাবি, ওই মাংস খাবার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হলে তা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারতেন ক্রেতারা। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মাংস সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে দ্রুত জীবাণু ছড়াতে পারে। সেই কারণে উদ্ধার হওয়া মাংস এবং অন্যান্য নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে সঙ্গে আলাদা করে ফেলা হয়।
এ ছাড়া, রেস্তোরাঁয় মজুত রাখা ঘিয়ের প্যাকেটেও গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। ওই ঘিয়ের কোনও ব্যাচ নম্বর ছিল না। এমনকি প্যাকেটে মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখও উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সেটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কত দিন ধরে রাখা হয়েছিল এবং আদৌ তা ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ, ব্যাচ নম্বর এবং মেয়াদ সংক্রান্ত তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক। এই তথ্য না থাকলে খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশাসনের আধিকারিকেরা রেস্তোরাঁর রান্নাঘরও ঘুরে দেখেন। সেখানে নোংরা পরিবেশ, অপরিষ্কার জায়গায় খাদ্যসামগ্রী রাখা এবং রান্নার কাজে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি না মানার অভিযোগ সামনে আসে। রান্নাঘরের এমন পরিস্থিতি দেখে উপস্থিত আধিকারিকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, কোনও রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন করার আগে রান্নার জায়গা পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা করে সংরক্ষণ করা এবং খাদ্যসামগ্রীর মেয়াদ নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
অভিযানের পর উদ্ধার হওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ও পচা খাবার প্রশাসনের উপস্থিতিতেই পুড়িয়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়। যাতে ওই খাবার কোনও ভাবেই ফের বাজারে বা রান্নাঘরে ব্যবহার করা না যায়, সে বিষয়েও নজর রাখা হয়। অতিরিক্ত জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক (২) দেবযানী বসু মল্লিক জানিয়েছেন, গঙ্গার ধারের ওই রেস্তোরাঁ থেকে একাধিক মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী এবং পচা মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের এই সময়সীমার মধ্যে রেস্তোরাঁর রান্নাঘর পরিষ্কার করা, খাদ্যসামগ্রী সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সরিয়ে ফেলা এবং খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
চুঁচুড়ার গঙ্গাতীরবর্তী এলাকায় একাধিক রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান রয়েছে। ছুটির দিন এবং সন্ধ্যার সময়ে বহু মানুষ পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে খেতে যান। ফলে এই ধরনের খাদ্যসুরক্ষা সংক্রান্ত অনিয়ম সামনে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, কোনও রেস্তোরাঁয় খাবারের স্বাদ বা পরিবেশের পাশাপাশি খাদ্যের গুণমান এবং পরিচ্ছন্নতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন শুধু ব্যবসার নিয়ম ভঙ্গ নয়, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
অভিযানের বিষয়ে রেস্তোরাঁর মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা কোনও মন্তব্য করতে চাননি। প্রশাসনের পরবর্তী পরিদর্শনে রেস্তোরাঁর পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, এখন সেটাই দেখার। তবে বৃহস্পতিবারের অভিযানে উদ্ধার হওয়া পচা মাংস, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার এবং লেবেলবিহীন ঘি ফের একবার সামনে এনে দিল, খাবারের দোকানগুলিতে নিয়মিত নজরদারি কতটা জরুরি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments