
নিউজ ডেস্ক; দুপুরে বাড়িতে কষিয়ে মাংস খেয়ে ভাতঘুম দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রবিবার দার্জিলিংয়ে ঘুম উড়েছিল সবার। পাহাড়জুড়ে তখন একটাই নাম—কাফু। ব্রাজ়িলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে এক ঝলক দেখার জন্য সকাল থেকেই উত্তেজনায় ফুটছিল শহর। জেন জ়ি থেকে জেন আলফা, তরুণ প্রজন্মের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। শহর থেকে কিছুটা দূরে লেবংয়ের গোর্খা স্টেডিয়ামে তিনি পৌঁছতেই হাজার হাজার দর্শকের চিৎকারে কার্যত কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। মাঠের বাইরেও তখন জমায়েত প্রায় হাজার খানেক মানুষের। চারপাশে একটাই আওয়াজ— “কাফু, কাফু, কাফু…”
বিশ্বকাপজয়ী এই তারকার আগমন ঘিরে দার্জিলিংয়ের উন্মাদনা ছিল একেবারেই অন্য রকম। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে কাফু শুধু ব্রাজ়িলের প্রাক্তন অধিনায়ক নন, বিশ্বফুটবলের অন্যতম পরিচিত মুখ। তাঁর পায়ে বল দেখার সুযোগ, তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার আশা—সব মিলিয়ে রবিবার পাহাড়ে যেন উৎসবের আবহ। আর সেই আবহেরই অপেক্ষায় এবার কলকাতা।
সোমবার বেলার দিকে দার্জিলিং থেকে কলকাতায় পৌঁছনোর কথা কাফুর। সফরসূচি অনুযায়ী, প্রথমে তিনি যাবেন নবান্নে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। এরপর ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজ সেরে তিনি পৌঁছবেন মধ্য কলকাতায়। বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ়ে শিল্পপতিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ব্রাজ়িলের এই কিংবদন্তি।
এর পরেই তাঁর যাওয়ার কথা একটি চ্যারিটি ইভেন্টে। ওই অনুষ্ঠানের গুডউইল অ্যাম্বাস্যাডর ‘এই সময়’। সেখানে দুঃস্থ শিশুদের হাতে ফুটবল তুলে দেওয়ার কথা কাফুর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের। চ্যারিটি অনুষ্ঠান শেষে হোটেলে ফিরে সামান্য বিশ্রাম নেবেন তিনি। তারপর সন্ধ্যাতেই বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। কলকাতা থেকে মুম্বই হয়ে দেশে ফিরবেন ব্রাজ়িলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।
ব্রাজ়িল দল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলতে আসার আগে কাফুর কলকাতা সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ইতিমধ্যেই মুম্বইয়ের একটি অনুষ্ঠানে এই ফিফা ফ্রেন্ডলি নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা এই তারকা। তাঁর বক্তব্য, ভারতের পক্ষে ব্রাজ়িলের মতো দলের বিরুদ্ধে খেলা উপকারী হবে।
সেই ম্যাচ ঘিরে কলকাতায় ইতিমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কাফুর সফর সেই আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বফুটবলের এক পরিচিত মুখকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ যে শহরের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের, তা দার্জিলিংয়ের রবিবারের ভিড়েই স্পষ্ট।
কলকাতার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে দার্জিলিংয়ে অবশ্য ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন কাফু। শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ১৪১ বছরের পুরোনো আর্য টি-এস্টেটে ‘সিদরা হিলস স্পোর্টস অ্যান্ড ওয়েলনেস রিসর্ট’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। চা-বাগান কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁকে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী খাদা পরিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।
এর পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় গোর্খা স্টেডিয়ামে। ম্যাচের আগে হুডখোলা গাড়িতে করে গোটা মাঠ ঘোরানো হয় কাফুকে। তাঁকে দেখতে তখন মাঠের ভিতরে-বাইরে ভিড় জমে গিয়েছে। দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে গোটা স্টেডিয়াম।
এ দিন ‘দার্জিলিং ওয়ারিয়র্স এফসি’ এবং ‘নর্থবেঙ্গল ফাইটার্স এফসি’ নামে দু’টি ফুটসল ক্লাবের উদ্বোধনও করেন তিনি। জার্সি উন্মোচনের পর দুই দলের মধ্যে একটি ম্যাচ হয়। আর সেখানেই সবাইকে চমকে দিয়ে এক দলের জার্সি পরে মাঠে নেমে পড়েন ব্রাজ়িলের এই কিংবদন্তি।
ম্যাচের প্রথমার্ধে ২০ মিনিট একটি দলের হয়ে খেলেন কাফু। দ্বিতীয়ার্ধে জার্সি বদলে অন্য দলের হয়ে মাঠে নামেন তিনি। দুই দলের হয়েই মাঠে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে আরও উন্মাদনা তৈরি করে। শুধু মাঠে নামাই নয়, পেনাল্টি থেকে একটি গোলও করেন ব্রাজ়িলের প্রাক্তন অধিনায়ক।
ম্যাচ শেষে দোভাষীর মাধ্যমে তরুণ ফুটবলারদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন কাফু। তিনি বলেন, “পড়াশোনা, খেলাধুলো এবং পরিবারকে দেখা—এই তিনটি দায়িত্বই একসঙ্গে পালন করতে হবে। পড়াশোনা ছাড়া ফুটবল এগোতে পারে না।”
কাফুর এই বক্তব্যে ফুটবলের পাশাপাশি শিক্ষার গুরুত্বও উঠে আসে। মাঠে সাফল্যের জন্য প্রতিভা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ—তরুণদের উদ্দেশে তাঁর বার্তায় সেই কথাই স্পষ্ট হয়েছে।
কাফুকে স্বাগত জানাতে রবিবার দার্জিলিংয়ে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা। ছিলেন দার্জিলিং ও কার্শিয়াংয়ের বিধায়করাও। উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দল আইজিজেএফের নেতা অজয় এডওয়ার্ডসও।
বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের সফরকে ঘিরে পাহাড়ে যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক পরিচয়ের গণ্ডি ছাপিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। দার্জিলিংয়ের পর এবার কলকাতার পালা। শহরের ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন, বিশ্বজয়ীর পায়ে আরও একবার ফুটবল-উন্মাদনা দেখার জন্য।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments